দিনাজপুর প্রতিনিধি: ‘পিতামাতা হারিয়ে শিশু নিকেতনে ঠাঁই পেয়ে শৈশব থেকে কৈশোর এবং কৈশোর থেকে যখন যৌবনে পা রেখেছিলাম, কখনো ভাবিনি আমার মতো এতিম মেয়ের বিয়ে এত ধুমধাম করে হবে। এত সুন্দর বিয়ের আয়োজন হবে কল্পনাও করিনি। আজ বুঝলাম, “যার কেউ নেই, তার আল্লাহ আছে”।’ বলছিলেন এতিম মেয়ে রিনা আক্তার।
গত শুক্রবার দিনাজপুর শহরের একটি কমিউনিটি সেন্টারে রিনাসহ তার মতো আরো ৩৯ জন এতিম মেয়ের ধুমধাম বিবাহোত্তর সংবর্ধনা অনুষ্ঠান হয়। সেখানেই কথা হচ্ছিল রিনার সঙ্গে। ঐ অনুষ্ঠানে লায়ন্স ক্লাবের শিশু নিকেতন হোমে আশ্রিত ৪০ জন এতিম মেয়ের বিবাহোত্তর সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। আলোকসজ্জা, গেট, স্টেজ, ভিডিও, কোনো কিছুরই কমতি ছিল না দিনাজপুর শহরের গ্রিনভিউ কমিউনিটি সেন্টারে।
কমিউনিটি সেন্টার সাজানো হয়েছিল নানা রঙের বেলুন দিয়ে। অনুষ্ঠানে একই সঙ্গে ৪০ জন পিতামাতাহীন এতিম মেয়েকে স্বামীর হাতে তুলে দেওয়া হলো। দিনাজপুর লায়ন্স ক্লাবের অধীনে শিশু নিকেতন নিবাসী এতিম মেয়েদের যৌতুকবিহীন বিয়ের আয়োজন করে লায়ন্স ক্লাব। বরযাত্রীসহ আমন্ত্রিত প্রায় ১ হাজার ২০০ অতিথির মধ্যে উন্নতমানের খাবার পরিবেশন করা হয়।
বিয়ের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় সংসদের হুইপ ইকবালুর রহিম এমপি, দিনাজপুর জেলা প্রশাসক খালেদ মোহাম্মদ জাকী, জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জয়নুল আবেদীন, জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপপরিচালক আবু বকর সিদ্দিক, দিনাজপুর শিল্প ও বণিক সমিতির সভাপতি রেজা হুমায়ুন চৌধুরী শামীম, দিনাজপুর সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মতুর্জা আল মুঈদ, দিনাজপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি স্বরূপ বকসী বাচ্চু, শহর সমাজসেবা অফিসার মাইনুল ইসলাম, করতোয়ার বার্তা সম্পাদক প্রদীপ ভট্টাচার্য, লায়ন্স ক্লাবের প্রেসিডেন্ট লায়ন সৈয়দ মিজানুর রহমান, জোন চেয়ারম্যান (ক্লাবস) লায়ন মোজাফফর আলী মিলন প্রমুখ। সঞ্চালনায় ছিলেন লায়ন বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট আলহাজ আব্দুল মজিদ।
জাতীয় সংসদের হুইপ ইকবালুর রহিম এমপি এমন মহৎ কাজে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘যৌতুক আমাদের সমাজে একটি ব্যাধি। এই ব্যাধি থেকে আমাদের সরে আসতে হবে। বর্তমান যে ৪০ জন ছেলে যৌতুক ছাড়াই এতিম মেয়েদের বিয়ে করেছে, সারা দেশে এটি একটি দৃষ্টান্ত।’ বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এতিমদের নানাভাবে সহযোগিতা করছেন। তাদের স্বাবলম্বী করতে সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রকল্প নিয়েছেন। ১৯৭৫ সালে প্রতিষ্ঠিত দিনাজপুর শিশু নিকেতন এ পর্যন্ত সাড়ে তিন শতাধিক এতিম মেয়েকে বিয়ে দিয়েছে।
শহরের ফুলবাড়ী বাসস্ট্যান্ড এলাকায় লায়ন্স ক্লাব পরিচালিত শিশু নিকেতন হোমে বর্তমানে ১০১ জন এতিম শিশুকন্যাকে লেখাপড়ার পাশাপাশি হাতের কাজ, সেলাই ও কম্পিউটার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এদের মধ্যে ৪০ জনের বিয়ে দেওয়া হলো গত শুক্রবার। ৪০ জন পাত্র ছিলেন দিনাজপুরসহ বিভিন্ন জেলা ও উপজেলার।
পাত্ররা কেউ ব্যবসায়ী, কেউ গার্মেন্টসে চাকরি করেন, কেউ কৃষিকাজ করেন, কারো আছে ওয়ার্কশপ। দিনাজপুরের হাকিমপুর উপজেলার বোয়ালদার গ্রামের আব্দুর রাজ্জাকের আছে দরজির দোকান। বিনা যৌতুকে শিশু নিকেতন হোমের এতিম কন্যা লিজা আক্তারকে বিয়ে করেছেন রাজ্জাক।



