বিশেষ প্রতিবেদক: রাজধানীর মহাখালী ওয়্যারলেস গেইট, টিঅ্যান্ডটি স্কুল রোড এবং কড়াইল বেলতলা রোড যেন এখন এক ‘মগের মুল্লুক’। সরকারি নিয়মকানুনকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে ফুটপাত থেকে শুরু করে মূল সড়কের দু’পাশ দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে কাঁচা বাজার, অবৈধ দোকানপাট এবং ভাঙারি মালের কারবার। দীর্ঘদিনের এই সড়ক দখলের পেছনে মদদ দিচ্ছে স্থানীয় রাজনৈতিক দলের প্রভাবশালী নেতারা। অন্যদিকে, ক্ষমতার পালাবদল হলেও কড়াইল বস্তিকে ঘিরে গড়ে ওঠা এই ভয়ংকর চাঁদাবাজির সাম্রাজ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি; কেবল পরিবর্তন হয়েছে চাঁদা তোলার হাত।
সরেজমিনে অনুসন্ধ্যানে জানা যায়, মহাখালী ওয়্যারলেস গেইট থেকে কড়াইল বেলতলাগামী সড়কের পুরো ফুটপাতই এখন অবৈধ দখলদাদের দখলে। ফুটপাত ঘেঁষে গড়ে তোলা হয়েছে স্থায়ী দোকানপাট। সড়কের একপাশ দখল করে বসানো হয়েছে কাঁচা বাজার, আর অন্যপাশজুড়ে রাখা হচ্ছে ভাঙারি দোকানের ভারী ও আবর্জনাময় মালামাল। ফলে টিঅ্যান্ডটি স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থী এবং সাধারণ পথচারীরা চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছে। হাঁটাহাঁটির ন্যূনতম জায়গা না থাকায় বাধ্য হয়ে সাধারণ মানুষকে মূল সড়ক দিয়ে বিপজ্জনকভাবে যাতায়াত করতে হচ্ছে।
সম্প্রতি এই সড়ক দখলের নির্মম বলি হতে হয়েছে এক নারী পথচারীকে। বেলতলা এলাকায় পথচারীদের হাঁটার জায়গা না থাকায় ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) একটি ময়লার গাড়ি এক নারীকে ধাক্কা দিলে ঘটনাস্থলেই তিনি নিহত হন। মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনার পরও টনক নড়েনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, পুরো এলাকা এখন চাঁদাবাজদের নিয়ন্ত্রণে জিম্মি। শুধুমাত্র বিকেলের ফুটপাত দোকানগুলো থেকেই প্রতিদিন দোকানপ্রতি ৫০ টাকা করে তোলা হচ্ছে চাঁদা। চায়ের দোকান থেকে খাবার ও চা খেয়েও টাকা না দিয়ে হুমকি দেওয়ার ঘটনা অহরহ ঘটছে। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে বা কেউ এর প্রতিবাদ করলে তাকেই উল্টো নানাভাবে হয়রানি ও অপরাধী-আসামী বানানোর ভয় দেখানো হয়। অভিযোগ রয়েছে, থানা পুলিশকেও নিয়মিত মাসোহারা দিয়ে ‘ম্যানেজ’ করে রাখা হয়েছে।
অনুরূপ চিত্র দেখা গেছে, টিঅ্যান্ডটি ঝিলপাড় এলাকাতেও। কড়াইলের অবৈধ নৌকা ঘাট বর্তমানে মাদক পাচারের অন্যতম বড় ও নিরাপদ রুটে পরিণত হয়েছে। এর পাশাপাশি রিকশার অবৈধ গ্যারেজ, অবৈধ বাজার, ইন্টারনেট ও ডিশ ব্যবসা, বিদ্যুৎ ও পানির অবৈধ সংযোগ এবং জুয়ার আসর বসিয়ে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে লাখ লাখ টাকা।
অনুসন্ধানে এই ভয়ংকর চাঁদাবাজি ও অবৈধ কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণের পেছনে একাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম উঠে এসেছে। এই তালিকায় রয়েছেন— ফজলু, তার ভাই সজল এবং তাদের বাবা সামাদ। এছাড়া রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে সক্রিয় রয়েছেন থানা ছাত্রদলের সভাপতি মেজবা উদ্দিন নাঈম, যুবদলের সিনিয়র সভাপতি সাঈদ, বিটিসিএল ও যুবদল নেতা ‘পেট কাটা’ সোহেল, নৌকা ঘাটের ম্যানেজার ও রিকশা গ্যারেজ মালিক সবুজ, নাডা শফিক, ডি বিল্ডিং মাসুম এবং তার ভাই বাইজিদ। ভাঙারি ব্যবসার আড়ালে চাঁদাবাজির সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন স্বেচ্ছাসেবক দলের ইউনিট সভাপতি ভাঙারি আমির। আর এলাকায় মাদকের ভয়াবহ বিস্তারের পেছনে ডিলার হিসেবে নাম উঠে এসেছে ওয়ার্ড স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক ‘পিচ্চি’ মাসুমের।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এসব কর্মকাণ্ডের প্রধান মদদদাতা হিসেবে নেপথ্যে কাজ করছেন বনানী থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক বাবুল শেখ।
নিরাপত্তার স্বার্থে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “এখানে আইনের কোনো শাসন নেই। সিটি কর্পোরেশনের গাড়িচাপায় মানুষ মারা যাওয়ার পরও সড়ক থেকে অবৈধ দোকান সরেনি। আমাদের সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে ভয় হয়। কথা বলতে গেলেই উল্টো মিথ্যা মামলা দিয়ে ফাঁসিয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়।”
টিঅ্যান্ডটি স্কুলের নবম শ্রেণীর এক শিক্ষার্থী জানায়, “প্রতিদিনই আমাদের জীবন ঝুঁকি নিয়ে রাস্তায় হাঁটতে হয়। ফুটপাতে হাঁটাহাঁটির কোনো সুযোগ নেই, পুরোটাই দোকানের দখলে। ময়লা ও ভাঙারি মালের কারণে সাধারণ মানুষের চলাচলের জায়গা বন্ধ হয়ে গেছে।”
অভিযোগের বিষয়ে বনানী থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক বাবুল শেখের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি তা অস্বীকার করে বলেন, “এসব চাঁদাবাজি বা অবৈধ দখলের সঙ্গে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। কোনো ব্যক্তি দলীয় নাম ভাঙিয়ে অপকর্ম করলে দল তার দায় নেবে না। রাজনৈতিকভাবে আমাদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার জন্য একটি মহল উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে নাম জড়ানোর চেষ্টা করছে।”
সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে বনানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সালাউদ্দিন বলেন, “পুলিশকে ম্যানেজ করে অপকর্ম চালানোর তথ্য সত্য নয়। অপরাধী যে-ই হোক, তার বিরুদ্ধে আমরা কঠোর অবস্থানে আছি। রাস্তা ও ফুটপাত দখলের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হচ্ছে এবং খুব দ্রুতই সংশ্লিষ্ট চাঁদাবাজ ও মাদক কারবারীদের আইনের আওতায় আনা হবে।”
নগর বিশ্লেষকরা মনে করছেন, রাজধানীর এই গুরুত্বপূর্ণ অংশে অবিলম্বে সমন্বিত অভিযান না চালালে পথচারীদের প্রাণহানির মতো ঘটনা আরও ঘটতে পারে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে পথচারীদের চলাচল নিশ্চিত করা এবং এই চাঁদাবাজ সিন্ডিকেট গুঁড়িয়ে দেওয়ার দাবি এলাকাবাসীর।




