খন রঞ্জন রায়: ‘আপনারে লয়ে বিব্রত রহিতে, আসে নাই কেহ অবনী পরে, সকলের তরে সকলে আমরা, প্রত্যেকে মোরা পরের তরে।’ কবি কামিনী রায়ের কবিতার রেশ ধরে উচ্চাকাঙ্ক্ষা গুঁড়িয়ে শুরু করেছিল মানব ভ্রাতৃত্ব দিবস। সংযুক্ত আরব আমিরাতের আমীর শেখ মুহম্মদ বিন জায়েদ নাড়িছেঁড়া যন্ত্রণার এক গভীর আলেখ্য সৃষ্টি করেছিলেন। তিনি ব্যতিক্রমী সম্মানের আয়োজন করে নিমন্ত্রণ করেছিলেন পূণ্যপিতা পোপ মহোদয় এবং আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রান্ড ইমাম আহম্মাদ আল-তায়েব মহোদয়কে।

বিশ্ব শ্রদ্ধাবোধের দুই দিকপাল দীর্ঘ আলোচনা শেষে প্রান্তিক মানুষজনের জীবনযন্ত্রণা উপলব্ধি করে উত্তরণের একটা চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন। ‘বিশ্বশান্তি এবং সমবেত জীবনের জন্য মানব-ভ্রাতৃত্ব’ শীর্ষক যুগান্তকারী এই চুক্তি ৪ঠা ফেব্রিয়ারি ২০১৯ খ্রিষ্টাব্দে আবুধাবিতে বসে হয়েছিল। গভীর মমত্ববোধের পরিচয় বহনকরা এই চুক্তি শ্রদ্ধাবোধের কালজয়ী উপাখ্যানরূপে গোটা বিশ্বে স্বীকৃত হয়েছে। মানুষের মনোজগতকে চিত্রায়ন করা এই চুক্তি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের সমন্বয়ে একটি মানব ভ্রাতৃত্ব বিষয়ক ঊর্ধ্বতন কমিটি গঠন করা হয়।

বৈচিত্র্যময় চরিত্রচিত্রণের বিশেষ এই চুক্তি সীমান্ত ছাড়িয়ে বৈশ্বিক স্তরে পৌঁছে যায়। ‘করুণা এবং চয়নের সঙ্গে’ নীতিবাক্য ধারণ করা পোপ ফ্রান্সিস ১৩ মার্চ ২০১৩ খ্রিষ্টাব্দে নির্বাচিত হয়ে ২০ মার্চ থেকে ২৬৬তম পোপ হিসাবে শ্রদ্ধার সাথে দায়িত্ব পরিচালনা করছেন। আর্জেন্টিনার বুয়েনোস আইরেস-এ ১৭ ডিসেম্বর ১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দে জন্ম নেওয়া পোপ ১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দে ক্যাথলিক পুরোহিত হিসাবে অভিষিক্ত হন। রোমান ক্যাথলিক যাজকদের প্রশিক্ষণ কলেজে পড়াশোনা করা রাসায়নিক প্রযুক্তিবিদ এই জ্ঞানী নানা আচারের মাধ্যমে ভ্যার্টিকান সিটির নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন। তৃতীয় গ্রেগরি-এর পরে ইউরোপের বাইরে থেকে প্রথম পোপ নির্বাচিত হন। তিনি আমেরিকা অঞ্চলের এবং দক্ষিণ গোলার্ধের প্রথম পোপ যিনি একাধারে রোমের বিশপ, বিশ্বব্যাপি ক্যাথলিক চার্চ এবং সার্বভৌম ভ্যাটিকান সিটি উভয়েরই প্রধান হিসাবে পবিত্র পিতা বলে ধর্মীয় রীতিকে সমুন্নত রাখছেন।

নিরাপদ খাদ্য নাগরিকের মৌলিক মানবাধিকার

আরো পড়ুনঃhttps://thecrimebd.net/news/61207/

২শ’ কোটি খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীর এই গুরু ২০০৮ খ্রিষ্টাব্দের ৪ থেকে ৬ নভেম্বর ভ্যাটিকান সিটিতে রোমান ক্যাথলিক এবং মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে আন্তঃধর্মীয় আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজন করেছিলেন। অনুষ্ঠিত আন্তঃধর্মীয় এই সম্মেলনে সৃষ্টিকর্তার নামে যে কোনো ধরনের সহিংসতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অঙ্গীকার করা হয়। প্রত্যেকের আলাদা-আলাদা ধর্ম চর্চার স্বাধীনতা এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষার ঘোষণাও দেয়া হয়েছিল। বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে পারস্পরিক ভুল বোঝাবুঝি, দূরত্ব, বিদ্বেষ দূর করাই ছিল মুল উদ্দেশ্য। মানুষে মানুষে ভ্রাতৃত্ব, সৌহার্দ্য আর বিশ্বব্যাপী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্যই ধর্ম।

সমাজ-সংস্কৃতি, রাজনীতি সব কিছুতেই ধর্মের প্রভাব আদিকাল থেকেই। বর্ণনার সূতা, তীব্র শ্লেষাত্মক বোধের জন্ম দিয়ে এর অপব্যবহার নিয়েই যত বিপত্তি। মুসলমান আর খ্রিষ্টানদের মধ্যে শান্তির সম্পর্ক সৃষ্টির আকাংক্ষা নিয়ে দু’ধর্মের ৫৮ জন চিন্তাবিদের উপস্থিতিতে তিন দিনের সম্মেলন শেষে এক ঐতিহাসিক যৌথ ঘোষণা করা হয়েছিল। ঘোষণায় ধর্মীয় বিভিন্ন সংঘাত এবং যে কোন জরুরি পরিস্থিতির সংকট নিরসনে পারস্পরিক সহযোগিতার অঙ্গীকার করা হয়। এই সম্মেলনের সার্থকতা আর হানাহানিতে মুক্তির আলোর রেখা দেখা দেয়।

১১০ একর আয়তনের পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষুদ্রতম স্বাধীন রাষ্ট্র ভ্যাটিকান সিটি তাদের হাজার বছরের ঐতিহ্য আর ১০৬০ সালে প্রণীত প্রাতিষ্ঠানিক আইন ভঙ্গ করে সম্প্রীতির এই সম্মেলনের অতিথি নির্বাচিত করেছিলেন। এক হাজার বছর ধরে ‘নো উইমেন অ্যালাউড’ বলবৎ হওয়া আইনে কোনো নারী তো নয়ই সেখানে মাদি কুকুর, বিড়াল, ভেড়া, ছাগল, গাভীরও প্রবেশ অনুমতি ছিল না।

১৯২৯ সালে স্বাধীন হওয়া প্রায় ১ হাজার জনসংখ্যার সবাই সাধু-সন্ন্যাসী পাদ্রি, ধর্মযাজক পুরুষ। নদীহীন-নারীহীন দেশ ১৯৮৪ সালে জাতিসংঘ ঘোষিত ‘বিশ্ব ঐতিহাসিক স্থান’ এবং নিরাপত্তার জন্য নিজস্ব ১০০ সদস্যের সেনাবাহিনী নিজস্ব মুদ্রা নিয়ে রাষ্ট্রপ্রধান হিসাবে পোপ-ই রাষ্ট্রের নির্বাহী কর্মকাণ্ড, আইন প্রণয়ন, বিচারব্যবস্থা, অর্থব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন। সেই অটল রক্ষণশীল ব্যবস্থার মধ্যে অসীম সাহসের আহ্বানে সম্প্রীতি সম্মলনে ২ পক্ষ থেকে ৫ জন নারী চিন্তাবিধ অংশ নিযে দায়িত্বশীল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন।
মানুষে মানুষে অদ্ভূত বৈপরীত্যের বরফ গলাতে শুরু করে এই সম্মেলন। মানুষের মায়ময় রূপ, মানবিক প্রশান্তি, পরিবেশের স্নিগ্ধতা ছড়িয়ে পড়তে থাকে।

আবুধাবি চুক্তির তৎপরতা বাড়ানো জরুরি মনে করে শ্রদ্ধেয় পোপ ২০২০ খ্রিষ্টাব্দে এক বিনীত আহ্বান করেন। ‘মানব-ভ্রাতৃত্ব’ স্বনির্ভর ও সমৃদ্ধির স্বাদ পেতে বিশেষ প্রার্থনা, উপবাস ও দয়ার কাজ করার অনুরোধ করেন। এই আহ্বান ছিল ২০২০ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ মে তারিখে। এটাই বৈশ্বিক বাস্তবতা মনে করে গোটা খিস্টমণ্ডলীয় সমাজে আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সাথে পালন করে। সমগ্র মানবজাতি হবে একটা পরিবার আর সকল মানবসমাজ হবে একে অপরের ভাইবোন এমন আকাক্সক্ষা নিয়ে ৩রা অক্টোবর ২০২০ খ্রিষ্টাব্দ তারিখে পোপ মহোদয় আরেকটি আহ্বান জানান।

পোপ ফ্রান্সিস মহোদয়ের এই আহ্বান যুগান্তকারী ও বিশ্বজনীন দলিল বলে বোধ জাগ্রত করার লড়াই শুরু হয়। ‘ফ্রাতেল্লী তুত্তি’ বা সকল ভাইবোন নামের উক্ত দলিল বিশ্বব্যাপি মানব-ভ্রাতৃত্ব ও সামাজিক বন্ধুত্ব গড়ে তোলার এক পূণ্যবতী নাম বলে স্বীকৃতি পায়। বৈশ্বিকভাবে বিস্ময়কর অবস্থানে থাকা অসুস্থ বিশ্ব, নতুন বিশ্ব নির্মাণের জন্য নতুন এক রূপরেখার উন্মেষ ঘটে। গভীর অর্থবহ এই আহ্বান কেবল ইসলাম-খ্রিষ্টান বা আব্রাহামিক ধর্মের মধ্যে বোঝাপড়াকে আরও গভীর করার গুরুত্ব বুঝায় না, সব ঝঞ্ঝা হটিয়ে সমস্ত ধর্ম ও বিশ্বাসের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব স্থাপনের লক্ষ্য নির্ধারণ করে। শিখ, বৌদ্ধ, হিন্দুধর্মসহ সমস্ত ধর্মের প্রতি ঘৃণা ও সহিংসতার বিরুদ্ধে লড়াই করার নির্দেশ দেয়। ধর্মান্ধতা, সহিংসতা, বিদ্বেষ ঘৃণাসূচক সকল কর্মকাণ্ড পরিহার করে বিশ্বের সব মানুষকে একটি মুক্ত পরিবেশের দিকে আহ্বান করে।

১৮৯৩ খ্রিষ্টাব্দের ১১ সেপ্টেম্বর আমেরিকার শিকাগোতে অনুষ্ঠিত বিশ্ব ধর্ম সম্মেলনে স্বামী বিবেকানন্দ হিন্দু ধর্মের বিশ্বজনীন সহনশীলতা ও গ্রহণযোগ্যতা বিষয়ে বিশ্বের কাছে তুলে ধরেছিলেন। তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছিলেন- ‘ধর্ম-সংযম, সাহস, মানবকল্যাণ আর নৈতিকতার আকরে ঘেরা একটি রূপ। বিশ্বব্যাপি ক্ষুধার্ত মানুষের জন্য খাবার ব্যবস্থা করাও ধর্মের অন্যতম প্রধান তাজা প্রত্যয়।’ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তার সেই আবিস্মরণীয় ভাষণ বর্তমান সময়েও অন্যতম প্রভাবশালী এক বক্তৃতা বলে বিবেচিত হয়ে আসছে। এরপর থেকে পৃথিবীর প্রেক্ষাপট, চিন্তাচেতনা, ভাব-ভাবনার পানি অনেকদূর গড়িয়েছে। নিপীড়িত মানুষ, জাতি, দেশসমূহ ঐক্যবদ্ধ হওয়ার চেষ্টা করেছে। সমবেতভাবে, সমবেত কন্ঠে বিশ্বভ্রাতৃত্বের জয়গান গাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। সংলাপ, সম্মান পারস্পরিক বোঝাপড়ার বিশ্বাস ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা দিন দিন বাড়তে থাকে। দেশ-বিদেশের জাতীয় পণ্ডিতবর্গ, বিজ্ঞানী, পরিবেশবিদ, চিকিৎসক, অধ্যাপক, প্রকৌশলী, ধর্মীয় চিন্তাবিদ সবাই একযোগে, একজোটে এগিয়ে এসে নানা আচার-অনাচার আর অসামঞ্জস্যের কথা তুলে ধরার চেষ্টা করছেন। একে-অপরের বিশ্বাসকে অবমাননাকারী আর অপবিজ্ঞানের বিরুদ্ধে একযোগে সোচ্চার হতে থাকেন।

৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ খ্রিষ্টাব্দের মানব-ভ্রাতৃত্বের নথিচুক্তি মানুষের অন্দরমহলের যাবতীয় দায়বোধকে নাড়া দেয়। এর পরের বছর আবব আমিরাতের রুচিশীল প্রয়োজনীয় চিন্তা আকাক্সক্ষার সাথে মিল খুঁজে পায় সৌদি আরব, বাহরাইন ও মিসর। বিশ্বের সকল ধর্মের মানুষের প্রতি তাদের সহানুভূতি, ভালোবাসা আর মূল্যবোধ প্রমাণের সূত্রের সূর্যোদয় ঘটে। স্বপ্ন ও বাস্তবের মাঝে বিভাজন রেখা কমিয়ে আনার প্রয়াসে ৪ফেব্রুয়ারি ২০২০ খ্রিষ্টাব্দে আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সাথে পালন করে ‘মানব ভ্রাতৃত্ব দিবস’। তাদের এই আনুষ্ঠানিকতার ভাবনায় পরিবর্তনের দোলা লাগে। অনেক দেশ আপনা থেকেই মাথা নত করে। পারস্পরিক দূরত্ব না বাড়িয়ে বরং একে অপরে আকৃষ্ট হয়, মুগ্ধ হয়।

আন্তরিক এই ঘটনাকে মাত্রা দেওয়ার জন্য এগিয়ে আসে জাতিসংঘ। ইতিহাসের চেতনার মতো মন মজে যায় জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তানিও গুতেরেসের। তিনি ধর্মের নামে দ্বদ্ব-সংঘর্ষ জিঁইয়ে না রেখে সকলের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পর্ক স্থপনের মোক্ষম সুযোগ হিসাবে কাজে লাগান। সবাইকে আবারো মনে করিয়ে দেন সাম্প্রদায়িকতার শ্রেণি নেই, বর্ণ নেই, গোত্র নেই, কেবল ঘৃণা উস্কে দেয়। এ-এক কঠিন যন্ত্রণা। এর বিরুদ্ধে চেতনা জোরদার করার উদ্দেশ্যে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে প্রস্তাব উপস্থাপন করেন। এই প্রস্তাবে কোনো দোদুল্যমানতা ছিল না। পারস্পরিক মতান্তর ও খামখেয়ালিপনাও ছিল না। বিনাবাক্যব্যয়ে সকল সদস্য রাষ্ট্র একযোগে এই প্রস্তাব সমর্থন করেন।

২১ ডিসেম্বর ২০২০ খ্রিষ্টাব্দে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ আল আজহারের শাইখ ও ভ্যাটিকানের পোপের স্বাক্ষরযুক্ত নথি অনুমোদন দেয়। আন্তর্জাতিকভাবে সহিষ্ণুতা গড়ে তোলা এবং বিশ্বব্যাপি শান্তির বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার বিভোর ভাবনা নিয়ে শুরু হয় ‘আন্তর্জাতিক মানব-ভ্রাতৃত্ব দিবস’। ভৌগোলিক বিভাজন আর ধর্মীয় উন্মাদনাকে অবদমিত করে ৪ ফেব্রিয়ারি ২০২১ খ্রিষ্টাব্দ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জাতিসংঘের মাধ্যমে শুরু হয় এই দিবস পালন। মানব-ভ্রাতৃত্বের অকুন্ঠ চেতনায় মানুষের মধ্যে সংহতি গড়ে ওঠবে। বিষবৃক্ষের হলাহল বন্ধ হবে; অভিঘাত সম্পন্ন মানসিকতা দূর হবে, মানুষে মানুষে ঐক্য প্রক্রিয়া বহন ও বিকশিত হবে আজকের দিনে এমন ভাবনায় উৎসাহ বোধ করছি।লেখকঃ খন রঞ্জন রায়, প্রাবন্ধিক

খন রঞ্জন রায়: ‘আপনারে লয়ে বিব্রত রহিতে, আসে নাই কেহ অবনী পরে, সকলের তরে সকলে আমরা, প্রত্যেকে মোরা পরের তরে।’ কবি কামিনী রায়ের কবিতার রেশ ধরে উচ্চাকাঙ্ক্ষা গুঁড়িয়ে শুরু করেছিল মানব ভ্রাতৃত্ব দিবস। সংযুক্ত আরব আমিরাতের আমীর শেখ মুহম্মদ বিন জায়েদ নাড়িছেঁড়া যন্ত্রণার এক গভীর আলেখ্য সৃষ্টি করেছিলেন। তিনি ব্যতিক্রমী সম্মানের আয়োজন করে নিমন্ত্রণ করেছিলেন পূণ্যপিতা পোপ মহোদয় এবং আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রান্ড ইমাম আহম্মাদ আল-তায়েব মহোদয়কে।

বিশ্ব শ্রদ্ধাবোধের দুই দিকপাল দীর্ঘ আলোচনা শেষে প্রান্তিক মানুষজনের জীবনযন্ত্রণা উপলব্ধি করে উত্তরণের একটা চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন। ‘বিশ্বশান্তি এবং সমবেত জীবনের জন্য মানব-ভ্রাতৃত্ব’ শীর্ষক যুগান্তকারী এই চুক্তি ৪ঠা ফেব্রিয়ারি ২০১৯ খ্রিষ্টাব্দে আবুধাবিতে বসে হয়েছিল। গভীর মমত্ববোধের পরিচয় বহনকরা এই চুক্তি শ্রদ্ধাবোধের কালজয়ী উপাখ্যানরূপে গোটা বিশ্বে স্বীকৃত হয়েছে। মানুষের মনোজগতকে চিত্রায়ন করা এই চুক্তি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের সমন্বয়ে একটি মানব ভ্রাতৃত্ব বিষয়ক ঊর্ধ্বতন কমিটি গঠন করা হয়।

বৈচিত্র্যময় চরিত্রচিত্রণের বিশেষ এই চুক্তি সীমান্ত ছাড়িয়ে বৈশ্বিক স্তরে পৌঁছে যায়। ‘করুণা এবং চয়নের সঙ্গে’ নীতিবাক্য ধারণ করা পোপ ফ্রান্সিস ১৩ মার্চ ২০১৩ খ্রিষ্টাব্দে নির্বাচিত হয়ে ২০ মার্চ থেকে ২৬৬তম পোপ হিসাবে শ্রদ্ধার সাথে দায়িত্ব পরিচালনা করছেন। আর্জেন্টিনার বুয়েনোস আইরেস-এ ১৭ ডিসেম্বর ১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দে জন্ম নেওয়া পোপ ১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দে ক্যাথলিক পুরোহিত হিসাবে অভিষিক্ত হন। রোমান ক্যাথলিক যাজকদের প্রশিক্ষণ কলেজে পড়াশোনা করা রাসায়নিক প্রযুক্তিবিদ এই জ্ঞানী নানা আচারের মাধ্যমে ভ্যার্টিকান সিটির নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন। তৃতীয় গ্রেগরি-এর পরে ইউরোপের বাইরে থেকে প্রথম পোপ নির্বাচিত হন। তিনি আমেরিকা অঞ্চলের এবং দক্ষিণ গোলার্ধের প্রথম পোপ যিনি একাধারে রোমের বিশপ, বিশ্বব্যাপি ক্যাথলিক চার্চ এবং সার্বভৌম ভ্যাটিকান সিটি উভয়েরই প্রধান হিসাবে পবিত্র পিতা বলে ধর্মীয় রীতিকে সমুন্নত রাখছেন।

নিরাপদ খাদ্য নাগরিকের মৌলিক মানবাধিকার

আরো পড়ুনঃhttps://thecrimebd.net/news/61207/

২শ’ কোটি খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীর এই গুরু ২০০৮ খ্রিষ্টাব্দের ৪ থেকে ৬ নভেম্বর ভ্যাটিকান সিটিতে রোমান ক্যাথলিক এবং মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে আন্তঃধর্মীয় আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজন করেছিলেন। অনুষ্ঠিত আন্তঃধর্মীয় এই সম্মেলনে সৃষ্টিকর্তার নামে যে কোনো ধরনের সহিংসতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অঙ্গীকার করা হয়। প্রত্যেকের আলাদা-আলাদা ধর্ম চর্চার স্বাধীনতা এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষার ঘোষণাও দেয়া হয়েছিল। বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে পারস্পরিক ভুল বোঝাবুঝি, দূরত্ব, বিদ্বেষ দূর করাই ছিল মুল উদ্দেশ্য। মানুষে মানুষে ভ্রাতৃত্ব, সৌহার্দ্য আর বিশ্বব্যাপী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্যই ধর্ম।

সমাজ-সংস্কৃতি, রাজনীতি সব কিছুতেই ধর্মের প্রভাব আদিকাল থেকেই। বর্ণনার সূতা, তীব্র শ্লেষাত্মক বোধের জন্ম দিয়ে এর অপব্যবহার নিয়েই যত বিপত্তি। মুসলমান আর খ্রিষ্টানদের মধ্যে শান্তির সম্পর্ক সৃষ্টির আকাংক্ষা নিয়ে দু’ধর্মের ৫৮ জন চিন্তাবিদের উপস্থিতিতে তিন দিনের সম্মেলন শেষে এক ঐতিহাসিক যৌথ ঘোষণা করা হয়েছিল। ঘোষণায় ধর্মীয় বিভিন্ন সংঘাত এবং যে কোন জরুরি পরিস্থিতির সংকট নিরসনে পারস্পরিক সহযোগিতার অঙ্গীকার করা হয়। এই সম্মেলনের সার্থকতা আর হানাহানিতে মুক্তির আলোর রেখা দেখা দেয়।

১১০ একর আয়তনের পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষুদ্রতম স্বাধীন রাষ্ট্র ভ্যাটিকান সিটি তাদের হাজার বছরের ঐতিহ্য আর ১০৬০ সালে প্রণীত প্রাতিষ্ঠানিক আইন ভঙ্গ করে সম্প্রীতির এই সম্মেলনের অতিথি নির্বাচিত করেছিলেন। এক হাজার বছর ধরে ‘নো উইমেন অ্যালাউড’ বলবৎ হওয়া আইনে কোনো নারী তো নয়ই সেখানে মাদি কুকুর, বিড়াল, ভেড়া, ছাগল, গাভীরও প্রবেশ অনুমতি ছিল না।

১৯২৯ সালে স্বাধীন হওয়া প্রায় ১ হাজার জনসংখ্যার সবাই সাধু-সন্ন্যাসী পাদ্রি, ধর্মযাজক পুরুষ। নদীহীন-নারীহীন দেশ ১৯৮৪ সালে জাতিসংঘ ঘোষিত ‘বিশ্ব ঐতিহাসিক স্থান’ এবং নিরাপত্তার জন্য নিজস্ব ১০০ সদস্যের সেনাবাহিনী নিজস্ব মুদ্রা নিয়ে রাষ্ট্রপ্রধান হিসাবে পোপ-ই রাষ্ট্রের নির্বাহী কর্মকাণ্ড, আইন প্রণয়ন, বিচারব্যবস্থা, অর্থব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন। সেই অটল রক্ষণশীল ব্যবস্থার মধ্যে অসীম সাহসের আহ্বানে সম্প্রীতি সম্মলনে ২ পক্ষ থেকে ৫ জন নারী চিন্তাবিধ অংশ নিযে দায়িত্বশীল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন।
মানুষে মানুষে অদ্ভূত বৈপরীত্যের বরফ গলাতে শুরু করে এই সম্মেলন। মানুষের মায়ময় রূপ, মানবিক প্রশান্তি, পরিবেশের স্নিগ্ধতা ছড়িয়ে পড়তে থাকে।

আবুধাবি চুক্তির তৎপরতা বাড়ানো জরুরি মনে করে শ্রদ্ধেয় পোপ ২০২০ খ্রিষ্টাব্দে এক বিনীত আহ্বান করেন। ‘মানব-ভ্রাতৃত্ব’ স্বনির্ভর ও সমৃদ্ধির স্বাদ পেতে বিশেষ প্রার্থনা, উপবাস ও দয়ার কাজ করার অনুরোধ করেন। এই আহ্বান ছিল ২০২০ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ মে তারিখে। এটাই বৈশ্বিক বাস্তবতা মনে করে গোটা খিস্টমণ্ডলীয় সমাজে আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সাথে পালন করে। সমগ্র মানবজাতি হবে একটা পরিবার আর সকল মানবসমাজ হবে একে অপরের ভাইবোন এমন আকাক্সক্ষা নিয়ে ৩রা অক্টোবর ২০২০ খ্রিষ্টাব্দ তারিখে পোপ মহোদয় আরেকটি আহ্বান জানান।

পোপ ফ্রান্সিস মহোদয়ের এই আহ্বান যুগান্তকারী ও বিশ্বজনীন দলিল বলে বোধ জাগ্রত করার লড়াই শুরু হয়। ‘ফ্রাতেল্লী তুত্তি’ বা সকল ভাইবোন নামের উক্ত দলিল বিশ্বব্যাপি মানব-ভ্রাতৃত্ব ও সামাজিক বন্ধুত্ব গড়ে তোলার এক পূণ্যবতী নাম বলে স্বীকৃতি পায়। বৈশ্বিকভাবে বিস্ময়কর অবস্থানে থাকা অসুস্থ বিশ্ব, নতুন বিশ্ব নির্মাণের জন্য নতুন এক রূপরেখার উন্মেষ ঘটে। গভীর অর্থবহ এই আহ্বান কেবল ইসলাম-খ্রিষ্টান বা আব্রাহামিক ধর্মের মধ্যে বোঝাপড়াকে আরও গভীর করার গুরুত্ব বুঝায় না, সব ঝঞ্ঝা হটিয়ে সমস্ত ধর্ম ও বিশ্বাসের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব স্থাপনের লক্ষ্য নির্ধারণ করে। শিখ, বৌদ্ধ, হিন্দুধর্মসহ সমস্ত ধর্মের প্রতি ঘৃণা ও সহিংসতার বিরুদ্ধে লড়াই করার নির্দেশ দেয়। ধর্মান্ধতা, সহিংসতা, বিদ্বেষ ঘৃণাসূচক সকল কর্মকাণ্ড পরিহার করে বিশ্বের সব মানুষকে একটি মুক্ত পরিবেশের দিকে আহ্বান করে।

১৮৯৩ খ্রিষ্টাব্দের ১১ সেপ্টেম্বর আমেরিকার শিকাগোতে অনুষ্ঠিত বিশ্ব ধর্ম সম্মেলনে স্বামী বিবেকানন্দ হিন্দু ধর্মের বিশ্বজনীন সহনশীলতা ও গ্রহণযোগ্যতা বিষয়ে বিশ্বের কাছে তুলে ধরেছিলেন। তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছিলেন- ‘ধর্ম-সংযম, সাহস, মানবকল্যাণ আর নৈতিকতার আকরে ঘেরা একটি রূপ। বিশ্বব্যাপি ক্ষুধার্ত মানুষের জন্য খাবার ব্যবস্থা করাও ধর্মের অন্যতম প্রধান তাজা প্রত্যয়।’ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তার সেই আবিস্মরণীয় ভাষণ বর্তমান সময়েও অন্যতম প্রভাবশালী এক বক্তৃতা বলে বিবেচিত হয়ে আসছে। এরপর থেকে পৃথিবীর প্রেক্ষাপট, চিন্তাচেতনা, ভাব-ভাবনার পানি অনেকদূর গড়িয়েছে। নিপীড়িত মানুষ, জাতি, দেশসমূহ ঐক্যবদ্ধ হওয়ার চেষ্টা করেছে। সমবেতভাবে, সমবেত কন্ঠে বিশ্বভ্রাতৃত্বের জয়গান গাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। সংলাপ, সম্মান পারস্পরিক বোঝাপড়ার বিশ্বাস ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা দিন দিন বাড়তে থাকে। দেশ-বিদেশের জাতীয় পণ্ডিতবর্গ, বিজ্ঞানী, পরিবেশবিদ, চিকিৎসক, অধ্যাপক, প্রকৌশলী, ধর্মীয় চিন্তাবিদ সবাই একযোগে, একজোটে এগিয়ে এসে নানা আচার-অনাচার আর অসামঞ্জস্যের কথা তুলে ধরার চেষ্টা করছেন। একে-অপরের বিশ্বাসকে অবমাননাকারী আর অপবিজ্ঞানের বিরুদ্ধে একযোগে সোচ্চার হতে থাকেন।

৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ খ্রিষ্টাব্দের মানব-ভ্রাতৃত্বের নথিচুক্তি মানুষের অন্দরমহলের যাবতীয় দায়বোধকে নাড়া দেয়। এর পরের বছর আবব আমিরাতের রুচিশীল প্রয়োজনীয় চিন্তা আকাক্সক্ষার সাথে মিল খুঁজে পায় সৌদি আরব, বাহরাইন ও মিসর। বিশ্বের সকল ধর্মের মানুষের প্রতি তাদের সহানুভূতি, ভালোবাসা আর মূল্যবোধ প্রমাণের সূত্রের সূর্যোদয় ঘটে। স্বপ্ন ও বাস্তবের মাঝে বিভাজন রেখা কমিয়ে আনার প্রয়াসে ৪ফেব্রুয়ারি ২০২০ খ্রিষ্টাব্দে আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সাথে পালন করে ‘মানব ভ্রাতৃত্ব দিবস’। তাদের এই আনুষ্ঠানিকতার ভাবনায় পরিবর্তনের দোলা লাগে। অনেক দেশ আপনা থেকেই মাথা নত করে। পারস্পরিক দূরত্ব না বাড়িয়ে বরং একে অপরে আকৃষ্ট হয়, মুগ্ধ হয়।

আন্তরিক এই ঘটনাকে মাত্রা দেওয়ার জন্য এগিয়ে আসে জাতিসংঘ। ইতিহাসের চেতনার মতো মন মজে যায় জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তানিও গুতেরেসের। তিনি ধর্মের নামে দ্বদ্ব-সংঘর্ষ জিঁইয়ে না রেখে সকলের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পর্ক স্থপনের মোক্ষম সুযোগ হিসাবে কাজে লাগান। সবাইকে আবারো মনে করিয়ে দেন সাম্প্রদায়িকতার শ্রেণি নেই, বর্ণ নেই, গোত্র নেই, কেবল ঘৃণা উস্কে দেয়। এ-এক কঠিন যন্ত্রণা। এর বিরুদ্ধে চেতনা জোরদার করার উদ্দেশ্যে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে প্রস্তাব উপস্থাপন করেন। এই প্রস্তাবে কোনো দোদুল্যমানতা ছিল না। পারস্পরিক মতান্তর ও খামখেয়ালিপনাও ছিল না। বিনাবাক্যব্যয়ে সকল সদস্য রাষ্ট্র একযোগে এই প্রস্তাব সমর্থন করেন।

২১ ডিসেম্বর ২০২০ খ্রিষ্টাব্দে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ আল আজহারের শাইখ ও ভ্যাটিকানের পোপের স্বাক্ষরযুক্ত নথি অনুমোদন দেয়। আন্তর্জাতিকভাবে সহিষ্ণুতা গড়ে তোলা এবং বিশ্বব্যাপি শান্তির বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার বিভোর ভাবনা নিয়ে শুরু হয় ‘আন্তর্জাতিক মানব-ভ্রাতৃত্ব দিবস’। ভৌগোলিক বিভাজন আর ধর্মীয় উন্মাদনাকে অবদমিত করে ৪ ফেব্রিয়ারি ২০২১ খ্রিষ্টাব্দ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জাতিসংঘের মাধ্যমে শুরু হয় এই দিবস পালন। মানব-ভ্রাতৃত্বের অকুন্ঠ চেতনায় মানুষের মধ্যে সংহতি গড়ে ওঠবে। বিষবৃক্ষের হলাহল বন্ধ হবে; অভিঘাত সম্পন্ন মানসিকতা দূর হবে, মানুষে মানুষে ঐক্য প্রক্রিয়া বহন ও বিকশিত হবে আজকের দিনে এমন ভাবনায় উৎসাহ বোধ করছি।লেখকঃ খন রঞ্জন রায়, প্রাবন্ধিক