ঢাকা ব্যুরো: ২০২৩ সালে সড়কপথে ছোট-বড় ৩৩ হাজার ৪৬৫ টি দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন ৪৯ হাজার ৯৯ জন এবং নিহত হয়েছে ৫ হাজার ৫৯২ জন।আজ রোববার (৩১ ডিসেম্বর) বিকেলে রাজধানীর বিজয় মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে সেভ দ্য রোড-এর মহাসচিব শান্তা ফারজানার পঠিত প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা যায়।
২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ১২ হাজার ২৫২ টি মোটর বাইক দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন ৭ হাজার ৮১৪ জন, নিহত হয়েছেন ৯০৪ জন; ৯ হাজার ৮৬৭ টি ট্রাক দুর্ঘটনায় আহত ১০ হাজার ৮৩৪ এবং নিহত হয়েছেন ৯৩৪ জন, নির্ধারিত গতিসীমা না মানা, পরিবহন মালিকদের উদাসিনতা ও সতর্কতা অবলম্বন না করায় বিশ্রাম না নিয়ে টানা ১২ থেকে ২০ ঘন্টা বাহন চালনাসহ বিভিন্ন নিয়ম না মানায় ১১ হাজার ৩৪৬ টি বাস দুর্ঘটনায় আহত ১৩ হাজার ১৮৫ এবং নিহত হয়েছেন ২ হাজার ২৪৩ জন, দায়িত্বে অবহেলা, স্থানিয় পুলিশ-প্রশাসনের দুর্নীতিসহ বিভিন্নভাবে সড়ক-মহাসড়কে অবৈধ বাহন নাসিমন-করিমন এবং অন্যান্য ৩ চাকার বিভিন্ন ধরণের বাহনে ১১ হাজার ১০৪ টি দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন ১২ হাজার ৭০৮ এবং নিহত হয়েছেন ১ হাজার ৫১১ জন।
সেভ দ্য রোড-এর চেয়ারম্যান ও সাবেক উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান জেড এম কামরুল আনাম, প্রতিষ্ঠাতা মোমিন মেহেদী, ভাইস চেয়ারম্যান বিকাশ রায়, জিয়াউর রহমান জিয়া, আইয়ুব রানা ও লায়ন ইমাম হোসেন-এর তত্বাবধায়নে দৈনিক যুগান্তর, দৈনিক দেশ রূপান্তর, দৈনিক দিনকাল, দৈনিক প্রথম আলো, দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক কালের কন্ঠ, বাংলাদেশ প্রতিদিন, দৈনিক জনকন্ঠ, দৈনিক কালবেলাসহ ২২ টি জাতীয় দৈনিক, আরটিভি, জিটিভি, যমুনা নিউজ, মাছরাঙ্গা, এটিএন বাংলাসহ ২০ টিভি-চ্যানেল, জাগো নিউজ, বাংলা নিউজ, বিডি নিউজসহ আঞ্চলিক ও স্থানিয় ৮৮ টি নিউজ পোর্টাল এবং স্থানিয় প্রত্যক্ষদর্শী-সেভ দ্য রোড-এর স্বেচ্ছাসেবিগণের দেয়া তথ্যানুসারে এই প্রতিবেদন দুর্ঘটনামুক্ত পথ-এর জন্য তৈরি করা হয়েছে।
আকাশ-সড়ক- রেল ও নৌপথ দুর্ঘটনামুক্ত করার জন্য নিবেদিত দেশের একমাত্র সচেতনতা-গবেষণা ও স্বেচ্ছাসেবি সংগঠন সেভ দ্য রোড-এর পক্ষ থেকে আরো জানানো হয়- ২০২৩ সালে নৌপথ দুর্ঘটনা ঘটেছে ৯০৫ টি। আহত হয়েছে ১ হাজার ৩১৪ জন, নিহত হয়েছে ১৯৬ জন। রেলপথ দুর্ঘটনা ঘটেছে ১ হাজার ১৯৬ টি। আহত হয়েছেন ১ হাজার ৫৯ জন। নিহত হয়েছেন ২৫৭ জন।
আমরা পথকে দুর্ঘটনামুক্ত করার জন্য যে চেষ্টা গত ১৬ বছর ধরে চালিয়ে যাচ্ছি, ছাত্র-যুব-জনতা সেই চেষ্টায় সম্পৃক্ত হচ্ছেন নিঃস্বার্থভাবে। আমরা তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ। কৃতজ্ঞ চালক-শ্রমিক ও যাত্রী সাধারণের প্রতিও; কেননা, নির্মম পথদুর্ঘটনারোধে তারা সেভ দ্য রোড-এর সাথে যুক্ত হচ্ছেন, সমর্থন জানাচ্ছেন, সচেতন করছেন সবাইকে, নিজেরাও সচেতনতার সাথে পথ চলছেন। আমরা মেট্রোরেল-এর সুফল পেতে শুরু করেছি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের যোগ্য উত্তরসূরী মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আন্তরিক প্রচেষ্টায়। তবু বাংলাদেশে সড়কপথে একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটেই চলছে কেবল যথাযথ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চালক ও সহযোগি না থাকায়; সড়কপথে প্রাণহানী ঘটেই চলছে ছাত্র-যুব-জনতার। আর রাজধানীসহ সারাদেশে তীব্র গণপরিবহন সংকট, অন্যদিকে ফিটনেস বিহীন-ত্রুটিপূর্ণ বাস-টেম্পুর অবাধ চলাচলের কারণেও যাচ্ছে প্রাণ। এমন পরিস্থিতির উত্তরণে সেভ দ্য রোড মাত্র ৭ টি দাবি নিয়ে এগিয়ে চলছে।
৭ দফা হলো- ১. বঙ্গবন্ধু কাপ ফুটবল খেলা শেষে বাড়িতে পাওয়ার পথে মিরেরসরাইতে নিহত অর্ধশত শিক্ষার্থীকে স্মরণিয় করে রাখতে ১১ জুলাইকে ‘দুর্ঘটনামুক্ত পথ দিবস’ ঘোষণা করতে হবে। ২. ফুটপাত দখলমুক্ত করে যাত্রীদের চলাচলের সুবিধা দিতে হবে। ৩. সড়ক পথে ধর্ষণ-হয়রানি রোধে ফিটনেস বিহীন বাহন নিষিদ্ধ এবং কমপক্ষে অষ্টম শ্রেণি উত্তীর্ণ ও জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যতিত চালক-সহযোগি নিয়োগ ও হেলপারদ্বারা পরিবহন চালানো বন্ধে সংশ্লিষ্ট সকলকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। ৪. স্থল-নৌ-রেল ও আকাশ পথ দূর্ঘটনায় নিহতদের কমপক্ষে ১০ লাখ ও আহতদের ৩ লাখ টাকা ক্ষতি পূরণ সরকারীভাবে দিতে হবে এবং হতাহতদের ইন্স্যুরেন্স স্কিমের ব্যবস্থা করতে হবে।৫. ‘ট্রান্সপোর্ট ওয়ার্কার্স রুল’ বাস্তবায়নের পাশাপাশি সত্যিকারের সম্মৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার লক্ষে ‘ট্রান্সপোর্ট পুলিশ ব্যাটালিয়ন’ বাস্তবায়ন করতে হবে। ৬. পথ দূর্ঘটনার তদন্ত ও সাজা ত্বরান্বিত করণের মধ্য দিয়ে সতর্কতা তৈরি করতে হবে এবং ট্রান্সপোর্ট পুলিশ ব্যাটালিয়ন গঠনের পূর্ব পর্যন্ত হাইওয়ে পুলিশ, নৌ পুলিশ সহ সংশ্লিষ্টদের আন্তরিকতা-সহমর্মিতা-সচেতনতার পাশাপাশি সকল পথের চালক-শ্রমিক ও যাত্রীদের আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। সকল পরিবহন চালকের লাইসেন্স থাকতে হবে। ৭. ইউলুপ বৃদ্ধি, পথ-সেতু সহ সংশ্লিষ্ট সকল মন্ত্রণালয়ে দূর্নীতি প্রতিরোধে সকলকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। যাতে ভাঙা পথ, ভাঙা সেতু আর ভাঙা কালভার্টের কারণে আর কোন প্রাণ দিতে না হয়।
আকাশ-সড়কপথ- নৌ ও রেলপথে চলমান সংকট নিরসনের লক্ষ্যে জরুরি ভিত্তিতে প্রাইভেটকার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণসহ ঢাকার রাজপথে সুপরিকল্পিতভাবে পাবলিক বাস বৃদ্ধি এবং যাত্রী হয়রানী-দুর্ঘটনা প্রতিরোধে প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। শুধু চালক নয়; আমাদের পথচারি ও যাত্রীদেরও প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। যার প্রাথমিক ধাপ প্রাথমিক-মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরের পাঠ্য বইয়ে ‘পথচলাচলে করণীয়’ একটি অধ্যায় রাখা। যেখানে পথ পরাপার কিভাবে করবে, তা শিশু বয়সেই শিখবে প্রাথমিক অঙ্গনে অধ্যায়ণরত শিশু-কিশোরগণ। এরপর মাধ্যমিকে কিভাবে বাহনে চড়বে, টিকিট কাটবে বা ভাড়া পরিশোধ করবে, তার বর্ণনা থাকবে
অন্যদিকে উচ্চ মাধ্যমিকে বাহন চালানো ও পথ চলার ধারণা নেয়ার ব্যবস্থা থাকবে। অবশ্য সরকারকে সাধুবাদ জানাই যে, তৃতীয় শ্রেণীর বইতে একটা ছোট্ট প্রয়াশ সেভ দ্য রোড-এর একের পর এক আন্দোলন ও দাবির ভিত্তিতে নেয়া হয়েছে। আগামীতে তা বৃহৎ পরিসরে সরকারীভাবে বাংলাদেশে শিক্ষা ব্যবস্থায় যুক্ত হওয়া আমাদের সময়ের দাবি। একই সাথে সকল পথকে স্বাভাবিক-সুন্দর-পরিচ্ছন্ন ও স্বচ্ছ করতে সকল পথের সকল বাহনের ভাড়া কমাতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ারও দাবি জানাচ্ছি ছাত্র-যুব-জনতার পক্ষ থেকে। রাজধানীর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফেরাতে ও টার্মিনালগুলো চাঁদাবাজি মুক্ত রাখতে এবং যানজট নিরসন ও ত্রুটিপূর্ণ গাড়ি চলাচল বন্ধসহ বিশেষ পরিস্থিতিতে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। গণপরিবহন সেক্টরে সৎ ব্যবসায়ীদের উৎসাহীত করতে জবরদস্তি সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণমুক্ত রুট পারমিট সহজিকরণসহ বিভিন্ন পর্যায়ে হয়রানি ও চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হবে। ঢাকা মহানগরীতে টেম্পু বা হিউম্যান হলারের মতো ক্ষুদ্র যানবাহনের চলাচল নিয়ন্ত্রণ, রুট পারমিট প্রথা চালু এবং আরামপ্রদ আসন-সংখ্যা ও যৌক্তিক যাত্রীভাড়া নির্ধারণ।
যোগাযোগ মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্টদের প্রতি অনুরোধ জানাবো বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর মত সারাদেশে সড়কপথে স্কুলশিক্ষার্থীদের জন্য ‘শিক্ষা সার্ভিস’ কার্যকর ভাবে চালুর উদ্যেগ নিন। সেক্ষেত্রে নৌপথে নৌ বাসও চালু করার আহ্বান জানাচ্ছি সেভ দ্য রোড-এর পক্ষ থেকে।
সড়কপথে দুর্ঘটনা কমাতে সরকার, পরিবহন মালিক ও বেসরকারি সংস্থাসমূহের যৌথ উদ্যোগে চালকসহ পরিবহন শ্রমিকদের সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণ প্রদানের ব্যবস্থাকে কার্যকর করার অনুরোধ জানাচ্ছি। যাতে করে পথ হয় লক্ষ্যে পৌছার, নিহত বা আহত হওয়ার মাধ্যম নয়। আমাদের সুপারিশ চালক, সুপারভাইজার, কন্ডাক্টর (ন্যূনতম অষ্টম শ্রেণি উত্তীর্ণ) ও হেল্পারসহ সকল পর্যায়ের পরিবহনকর্মীদের জাতীয় পরিচয়পত্র, লাইসেন্স, মালিক কর্তৃক নিয়োগপত্র প্রদান, কর্মঘন্টা নির্ধারণ, উৎসব বোনাস ও ওভারটাইম ভাতা বাধ্যতামূলক করতে হবে। বেপরোয়া দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সড়কপথ, মহাসড়কপথ ও আঞ্চলিক সড়কপথগুলো ডাবল লেন ও ৪ লেনে উন্নিতকরণসহ নিয়মিত সংস্কার, ঝুঁকিপূর্ণ বাঁকগুলো চিহ্নিতকরণ এবং সতর্কীকরণ নোটিশ জারির সাথে ফুটপাতকে দখলমুক্ত করতে হবে। সকল পথের সকল বাহনে ‘যাত্রীবিমা’ এবং যাত্রী ও পণ্যবাহী সব গাড়িতে চালক, কন্ডাক্টর ও হেল্পারের জীবন বিমা চালু করতে হবে।
বিচারের সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে দুর্ঘটনামুক্ত পথ চাই। এই পথকে শান্তি ও সমৃদ্ধির করে গড়ে তুলতে একের পর এক ফ্লাইওভার বা ব্রিজ-কালভার্ট নির্মাণ নয়; রাস্তা প্রশস্ত ও ফুটপাত দখলমুক্ত করে পথচারিদের চলাচল উপযোগি করার দাবি বরাবরের মত জানাচ্ছি।



