*চট্টগ্রামে কত মার্কেট-শপিংমল প্রয়োজন—পরিকল্পনা কি আছে?
ইফতেখার, নগর প্রতিবেদক: চট্টগ্রাম শহর কি তার প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত মার্কেট ও শপিংমলের ভার বহন করছে? নগরীর জনসংখ্যা, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা, যানবাহনের সংখ্যা, সড়কের ধারণক্ষমতা এবং বাণিজ্যিক এলাকার পরিমাণ বিবেচনায় নিয়ে আদৌ কতগুলো মার্কেট বা শপিংমল প্রয়োজন—এমন কোনো সমন্বিত হিসাব কি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে রয়েছে? নাকি যেখানে জমি ও বিনিয়োগের সুযোগ মিলছে, সেখানেই গড়ে উঠছে নতুন নতুন বাণিজ্যিক স্থাপনা?
চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন এলাকায় এরই মধ্যে অসংখ্য মার্কেট, বিপণিবিতান ও শপিংমল রয়েছে। নিউ মার্কেট, রিয়াজউদ্দিন বাজার, চট্টগ্রাম শপিং কমপ্লেক্স, আফমি প্লাজা, সানমার ওশান সিটি, ফিনলে স্কয়ারসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক স্থাপনা নগরীর বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের বড় অংশ ধারণ করছে।
প্রশ্ন উঠছে, এসব বাণিজ্যিক স্থাপনার সঙ্গে নগরীর সড়কব্যবস্থা, পার্কিং সুবিধা, পথচারী চলাচল, গণপরিবহন ও আশপাশের এলাকার ধারণক্ষমতার মধ্যে যথেষ্ট সমন্বয় হচ্ছে কি না। একটি মার্কেট বা শপিংমল শুধু একটি ভবন নয়। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে প্রতিদিনের বিপুল মানুষের চলাচল, ব্যক্তিগত গাড়ি, গণপরিবহন, পণ্যবাহী যান, লোড-আনলোডিং, পার্কিং এবং পথচারীর চাপ। ফলে কোনো এলাকায় নতুন বাণিজ্যিক স্থাপনা অনুমোদনের আগে শুধু ভবন নির্মাণের জায়গা আছে কি না—এ প্রশ্ন যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন ওই এলাকার সামগ্রিক ট্রাফিক ও নগর অবকাঠামোর ওপর এর প্রভাব মূল্যায়ন।
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) আইনগত ও পরিকল্পনাগত দায়িত্বের মধ্যে ভূমির যৌক্তিক ব্যবহার নিশ্চিত করা, মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন এবং অপরিকল্পিত উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণের বিষয় রয়েছে।
সিডিএ বর্তমানে চট্টগ্রাম মহানগরীর ২০২৫–২০৫০ খসড়া মহাপরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এই মহাপরিকল্পনার আওতায় নগরীর ভবিষ্যৎ উন্নয়নকে আরও পরিকল্পিত ও টেকসই করার লক্ষ্য রয়েছে। তাহলে নগরবাসীর প্রশ্ন—এই মহাপরিকল্পনায় বাণিজ্যিক স্থাপনার জন্য এলাকাভিত্তিক প্রয়োজন নির্ধারণ করা হয়েছে কি না?
কোন এলাকায় কত মানুষ বসবাস করে, কোথায় কত মার্কেট রয়েছে, বিদ্যমান মার্কেটগুলোর ধারণক্ষমতা কত, নতুন বাণিজ্যিক স্থাপনার প্রয়োজন কতটুকু, কোন সড়কে কত যানবাহন চলাচল করে এবং নতুন কোনো শপিংমল হলে ওই এলাকায় অতিরিক্ত কত যানবাহন ও মানুষের চাপ তৈরি হবে—এসব বিষয় কি অনুমোদনের আগে সমন্বিতভাবে পর্যালোচনা করা হয়?
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) সম্প্রতি প্রায় আট গুণ বড় এলাকা নিয়ে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন মাস্টার প্ল্যান ২০২৫-২০৫০ এর খসড়া চূড়ান্ত করেছে। এই দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো মূল শহরের ওপর চাপ কমিয়ে বাণিজ্যিক বিকেন্দ্রীকরণ করা। এর আওতায় শহরের প্রধান প্রবেশদ্বার ও নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর (যেমন: আনোয়ারা, পটিয়া) কাছাকাছি পরিকল্পিত বাণিজ্যিক জোন বা হাব গড়ে তোলা হবে, যেখানে আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন বাণিজ্যিক স্পেস থাকবে।
অন্যদিকে, মার্কেট নির্মাণ ও পরিচালনার ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনেরও ভূমিকা রয়েছে। সরকারি নথিতে সিটি কর্পোরেশনের মালিকানাধীন ভূমিতে মার্কেট বা দোকান নির্মাণ এবং দোকান বরাদ্দের বিধানও রয়েছে। তবে নগরবাসীর প্রত্যাশা, সিডিএ, সিটি কর্পোরেশন, ট্রাফিক পুলিশ এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সংস্থার মধ্যে সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হোক—কোথায় নতুন বাণিজ্যিক স্থাপনা প্রয়োজন, কোথায় আর নয়।
কারণ একটি শহরের উন্নয়ন শুধু নতুন ভবন নির্মাণের সংখ্যা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। উন্নয়ন তখনই টেকসই হয়, যখন নতুন স্থাপনার সঙ্গে রাস্তা, পার্কিং, গণপরিবহন, ড্রেনেজ, পথচারী চলাচল ও পরিবেশগত সক্ষমতার সমন্বয় থাকে।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, বাণিজ্যিক স্থাপনা কোথায় হবে, তার সঙ্গে পরিবহনব্যবস্থার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। তাই বাণিজ্যিক ভবনের অনুমোদনের ক্ষেত্রে শুধু ভবনের নকশা নয়, আশপাশের সড়ক ও ট্রাফিক ব্যবস্থার ওপর সম্ভাব্য প্রভাবও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
চট্টগ্রামবাসীর প্রশ্ন তাই সরল—শহরের প্রয়োজন কতটুকু, আর আমরা তৈরি করছি কতটুকু? যদি চাহিদার তুলনায় মার্কেট ও শপিংমলের সংখ্যা ইতোমধ্যেই পর্যাপ্ত হয়ে থাকে, তাহলে নতুন নতুন বাণিজ্যিক স্থাপনার অনুমোদনের যৌক্তিকতা কী? আর যদি নতুন মার্কেটের প্রয়োজন থাকে, তাহলে কোন এলাকায় কতটি প্রয়োজন এবং সেই সিদ্ধান্তের ভিত্তি কী?
পূর্বে নির্মিত সিডিএ কিংবা সিটি কর্পোরেশনের বেশ কিছু বাণিজ্যিক মার্কেট সঠিক পরিকল্পনার অভাবে বা পার্কিং ও সংযোগ সড়কের সংকটে অব্যবহৃত থেকে গেছে। তাই নতুন মহাপরিকল্পনায় কঠোর নিয়ম করা হচ্ছে যাতে যে কোনো বড় শপিং মল বা কমার্শিয়াল বিল্ডিং করার আগে পর্যাপ্ত কার পার্কিং, প্রশস্ত সংযোগ সড়ক এবং নিজস্ব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা হয়। আইন অমান্য করে গড়ে ওঠা কমার্শিয়াল স্পেসের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনাও রাখা হয়েছে।
এ বিষয়ে সিডিএ ও সিটি কর্পোরেশনের কাছে নগরবাসীর প্রত্যাশা—চট্টগ্রাম শহরের বিদ্যমান মার্কেট, শপিংমল ও বাণিজ্যিক স্থাপনার একটি সমন্বিত তালিকা ও এলাকাভিত্তিক চাহিদা জরিপ প্রকাশ করা হোক। পাশাপাশি নতুন বাণিজ্যিক স্থাপনা অনুমোদনের ক্ষেত্রে ট্রাফিক, পার্কিং ও অবকাঠামোগত সক্ষমতার বিষয়টি বাধ্যতামূলকভাবে বিবেচনা করা হোক।
নগরবাসী উন্নয়ন চায়, নতুন মার্কেট বা শপিংমলের বিরোধিতা নয়। কিন্তু এমন উন্নয়নও চায় না, যার কারণে একদিকে বাণিজ্যিক স্থাপনা বাড়বে, অন্যদিকে রাস্তা সংকুচিত হবে, পার্কিং সংকট বাড়বে এবং যানজট আরও তীব্র হবে।
পরিকল্পিত বাণিজ্যিক উন্নয়ন নাকি যত্রতত্র মার্কেট—চট্টগ্রামের ভবিষ্যৎ নগর পরিকল্পনায় এখনই এর সুস্পষ্ট উত্তর প্রয়োজন।




