দি ক্রাইম ডেস্ক: মহেশখালীতে একটি এলএনজি টার্মিনাল বন্ধের ধাক্কায় দেশ তীব্র গ্যাস-সংকট চলছে। চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস না পাওয়ায় কমেছে বিদ্যুৎ উৎপাদন। এর সঙ্গে কয়লা ও তরল জ্বালানি সরবরাহে সমস্যা এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারিগরি ত্রুটি যুক্ত হয়ে লোডশেডিং আরও বেড়েছে। শনিবার রাত ১টায় দেশে বিদ্যুতের ঘাটতি একপর্যায়ে প্রায় ২ হাজার ৯১৬ মেগাওয়াটে পৌঁছায়।
গ্যাসের সংকটে শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। প্রায় অর্ধেকে নেমেছে অনেক কারখানার উৎপাদন। বাসাবাড়িতে জ্বলছে না বা ঢিমেতেতালে জ্বলছে রান্নার চুলা। সিএনজি স্টেশনগুলোতে তৈরি হওয়া দীর্ঘ সারি সরছে না। অন্যদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ায় রাজধানীর বাইরে, বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় লোডশেডিংয়ের কারণে ভোগান্তি বেড়েছে।
পেট্রোবাংলার একাধিক কর্মকর্তা জানান, ২১ জুলাইতে কক্সবাজারের মহেশখালীতে বঙ্গোপসগারে পেট্রোবাংলার মালিকানাধীন এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ড ঘটে। এরপর এটি থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। টার্মিনালটি পুরোপুরি সচল করতে আগামী ১০ আগস্ট পর্যন্ত সময় চেয়েছে পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান এক্সিলারেট এনার্জি। বন্ধ এলএনজি টার্মিনালের অক্ষত অংশটি চলতি সপ্তাহেই চালু করা যাবে। এতে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাস যোগ হবে। আর টার্মিনালটি পুরোপুরি চালু হতে পারে আগামী সপ্তাহে।
তবে কবে এটি চালু হবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
গ্যাস সরবরাহ নেমেছে ২১০ কোটি ঘনফুটে
আমদানি করা এলএনজি গ্যাসে রূপান্তর করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের জন্য কক্সবাজারের মহেশখালীতে দুটি ভাসমান টার্মিনাল বা এফএসআরইউ রয়েছে। এর একটির মালিকানা পেট্রোবাংলার এবং অপরটির মালিকানা সামিটের। দুইটিই পরিচালনা করে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এক্সিলারেট এনার্জি। গত ২১ জুলাই আগুন ও কারিগরি ত্রুটির কারণে এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। এরপর থেকেই দেশে গ্যাসের সংকট তীব্র হতে থাকে।
গত কয়েক বছর ধরে স্বাভাবিক সময়ে দেশে দৈনিক প্রায় ২৬০ থেকে ২৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়। টার্মিনালটি বন্ধ হওয়ার পর সরবরাহ নেমে এসেছে প্রায় ২১০-২১৫ কোটি ঘনফুটে। অথচ দৈনিক চাহিদা প্রায় ৪১০ কোটি ঘনফুট।
দেশের মোট গ্যাস সরবরাহের ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ সাধারণত আমদানি করা এলএনজি থেকে আসে। এ অবস্থায় আবাসিক, শিল্প, বিদ্যুৎ ও সিএনজিসহ সব খাতেই সরবরাহ কমানো হয়েছে। তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত তাদের আওতাধীন সব শ্রেণির গ্রাহক তীব্র স্বল্পচাপের মুখে থাকবেন।
বিদ্যুৎ উৎপাদন কমেছে
গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। সাধারণত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে দৈনিক প্রায় ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়। শুক্রবার এই সরবরাহ নেমে আসে প্রায় ৬৭ কোটি ৩০ লাখ ঘনফুটে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের হিসাবে, গ্যাসের অভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমেছে দেড় হাজার মেগাওয়াটের বেশি। শনিবার রাত ১টার দিকে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ১৫৪ মেগাওয়াট। বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে ১৩ হাজার ২৩৮ মেগাওয়াট। ঘাটতি ছিল প্রায় ২ হাজার ৯১৬ মেগাওয়াট। দিনের বিভিন্ন সময়েও বিদ্যুতের ঘাটতি আড়াই হাজার মেগাওয়াটের ওপরে ছিল। দেশে মোট স্থাপিত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৯ হাজার মেগাওয়াটের বেশি হলেও জ্বালানির অভাবে ও কারিগরি ত্রুটির কারণে অর্ধেক সক্ষমতাও ব্যবহার করা যাচ্ছে না অনেক সময়।
গ্যাসের পাশাপাশি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতেও জ্বালানি সরবরাহে সমস্যা দেখা দিয়েছে। কিছু বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র কয়লা সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার কথা জানিয়েছে। কয়েকটি ফার্নেস অয়েলচালিত কেন্দ্রেও জ্বালানি সংকট রয়েছে। এর মধ্যে বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট কারিগরি ত্রুটির কারণে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। প্রাথমিকভাবে ইউনিটটির ‘থ্রাস্ট বিয়ারিং’-এর তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়াকে সমস্যার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
লোডশেডিং বেশি ঢাকার বাইরে
বিদ্যুৎ উৎপাদনের ঘাটতি সামাল দিতে দেশ জুড়ে লোডশেডিং করা হচ্ছে। তবে রাজধানীর তুলনায় জেলা ও গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিংয়ের মাত্রা বেশি। গ্যাসের অভাবে বাসাবাড়িতে রান্না করতে না পেরে অনেকে বৈদ্যুতিক চুলা, রাইস কুকার ও অন্যান্য বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ব্যবহার করছেন। এতে বিদ্যুতের চাহিদা আরও বেড়েছে। নিয়মিত বৃষ্টি ও তুলনামূলক কম তাপমাত্রার কারণে শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের ব্যবহার কিছুটা কম থাকায় চাহিদা নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তা না হলে লোডশেডিং আরও বাড়তে পারত বলে মনে করেন পিডিবির কর্মকর্তারা। বেশি খরচের তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদন বাড়িয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু তরল জ্বালানির সরবরাহেও সমস্যা থাকায় সব কেন্দ্র প্রয়োজন অনুযায়ী চালানো যাচ্ছে না।
বাসাবাড়িতে, সিএনজিতে ও শিল্পে দুর্ভোগ
ঢাকার রামপুরা, মিরপুর, উত্তরা, মগবাজার, মোহাম্মদপুর, আদাবরসহ বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা কয়েক দিন ধরে রান্নার চুলায় গ্যাস না পাওয়ার অভিযোগ করছেন। অনেক এলাকায় গভীর রাতেও গ্যাসের চাপ পাওয়া যাচ্ছে না। ঘড়ির কাঁটা ধরে গ্যাসের অপেক্ষায় থাকেন অনেক গৃহিণী।
সিএনজি স্টেশনগুলোতেও প্রয়োজনীয় চাপ না থাকায় যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হচ্ছে। অনেক স্টেশন দিনের বড় সময় গ্যাস সরবরাহ করতে পারছে না। অনেকে ব্যক্তিগত গাড়ি রাস্তায় নামানো বন্ধ করেছেন।
নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও ভালুকাসহ প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলোতেও গ্যাসের চাপ তীব্রভাবে কমেছে। কোনো কোনো কারখানা উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে। অনেক কারখানা সক্ষমতার ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ ব্যবহার করে উৎপাদন চালাচ্ছে। বিকল্প হিসেবে ডিজেল ব্যবহারে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। একই সঙ্গে ঘনঘন লোডশেডিং শিল্পের সংকট আরও বাড়িয়ে তুলছে।
পরিস্থিতি সহনীয় হবে কবে
পেট্রোবাংলা সূত্র জানায়, বন্ধ টার্মিনালের কিছু অংশ মেরামত করতে কিছু যন্ত্রাংশ প্রয়োজন ছিল যেগুলো দেশে ছিল না। সেগুলো আনা হয়েছে। এছাড়া অক্ষত অংশ থেকে চলতি সপ্তাহেই গ্যাস সরবরাহ চালুর চেষ্টা চলছে। প্রয়োজনীয় কিছু যন্ত্রাংশ বিদেশ থেকে এনে টার্মিনালে পৌঁছানো হয়েছে। বিদেশি কারিগরি দলের সঙ্গে দেশীয় প্রকৌশলীরাও মেরামত কাজ করছেন। অক্ষত অংশটি চালু করা গেলে দৈনিক প্রায় ৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যোগ হতে পারে। তখন বিদ্যুৎ, শিল্প ও আবাসিক খাতে সরবরাহ কিছুটা বাড়ানো সম্ভব হবে। ফলে গ্যাসের স্বল্পচাপ ও লোডশেডিং দুটিই কিছুটা কমে আসতে পারে। তবে টার্মিনালটি পুরোপুরি সচল করতে আগামী সপ্তাহ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।




