আমেনা বেগম(এমএসএস) : আজ ১৪ জুলাই। বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি, সাবেক সেনাপ্রধান এবং জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের ৭ম মৃত্যুবার্ষিকী। ২০১৯ সালের এই দিনে রাজধানীর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৯ বছর। আজ তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে জাতীয় পার্টিসহ বিভিন্ন সংগঠন কোরআনখানি, দোয়া মাহফিল, কবর জিয়ারত ও স্মরণসভাসহ নানা কর্মসূচি পালন করছে। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ও বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব। একদিকে তিনি ছিলেন সামরিক শাসক, অন্যদিকে দীর্ঘ সময় ধরে জাতীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়। তাঁর শাসনামলে যেমন অবকাঠামোগত উন্নয়ন, প্রশাসনিক সংস্কার ও স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তেমনি গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক স্বাধীনতা প্রশ্নেও তাঁর শাসন তীব্র সমালোচিত হয়েছে। ফলে মৃত্যুর সাত বছর পরও তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়ে বিতর্ক থামেনি।
সেনাবাহিনী থেকে রাষ্ট্রক্ষমতায়
১৯৩০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ভারতের কোচবিহারের দিনহাটায় জন্মগ্রহণ করেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। দেশভাগের পর তাঁর পরিবার পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষা শেষ করে তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে ১৯৭৮ সালে সেনাপ্রধান নিযুক্ত হন। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তারকে অপসারণ করে রক্তপাতহীন সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তিনি রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন। প্রথমে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক (সিএমএলএ) এবং পরে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৮৩ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন।
জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠা
রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকাকালীন ১৯৮৬ সালে তিনি জাতীয় পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন। দলটি দ্রুত দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়। সরকারি প্রশাসন, স্থানীয় সরকার প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণে জাতীয় পার্টি সাংগঠনিক ভিত্তি গড়ে তোলে। ক্ষমতা হারানোর পরও জাতীয় পার্টিকে তিনি দেশের তৃতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে ধরে রাখতে সক্ষম হন। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বাইরে জাতীয় পার্টি দীর্ঘদিন জাতীয় রাজনীতিতে ভারসাম্য রক্ষাকারী দলের ভূমিকায় ছিল।
উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের মূল্যায়ন
এরশাদের সমর্থকদের মতে, তাঁর শাসনামলে দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়। বিশেষ করে— উপজেলা পরিষদ ব্যবস্থা চালু ও স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ। সারা দেশে গ্রামীণ সড়ক নির্মাণ ও যোগাযোগ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ। বহু সেতু, কালভার্ট ও সরকারি ভবন নির্মাণ। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে সেচ ও সার ব্যবস্থাপনায় গুরুত্ব। প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের উদ্যোগ। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্প। তাঁর সময়েই উপজেলা পরিষদ ব্যবস্থা দেশের প্রশাসনিক কাঠামোয় নতুন মাত্রা যোগ করে। যদিও পরবর্তী সময়ে এর কার্যকারিতা নিয়ে নানা বিতর্ক তৈরি হয়, তবুও স্থানীয় সরকার বিকেন্দ্রীকরণের ক্ষেত্রে এই উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা
১৯৮৮ সালে সংবিধানের অষ্টম সংশোধনীর মাধ্যমে ইসলামকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করা হয়। এটি ছিল তাঁর শাসনামলের সবচেয়ে আলোচিত সাংবিধানিক সিদ্ধান্তগুলোর একটি। এই সিদ্ধান্ত আজও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়।
স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন
এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে আশির দশকের শেষভাগে ছাত্রসমাজ, পেশাজীবী, বুদ্ধিজীবী এবং প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তোলে। দীর্ঘ আন্দোলন, ধর্মঘট, অবরোধ ও গণআন্দোলনের মুখে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর তিনি রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। এই ঘটনাকে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
কারাবাস ও প্রত্যাবর্তন
ক্ষমতা ছাড়ার পর এরশাদ বিভিন্ন দুর্নীতির মামলায় গ্রেপ্তার হন এবং কয়েক বছর কারাভোগ করেন। তবে কারাগারে থেকেও তিনি নির্বাচনে অংশ নিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরে ধীরে ধীরে সক্রিয় রাজনীতিতে ফিরে আসেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তিনি এমন একজন নেতা, যিনি রাষ্ট্রক্ষমতা হারানোর পরও দীর্ঘ প্রায় তিন দশক জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হন।
আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যকার ভারসাম্য
পরবর্তী সময়ে জাতীয় পার্টি কখনও আওয়ামী লীগের, কখনও বিএনপির সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতা করেছে। আবার অনেক সময় বিরোধী দলের ভূমিকাও পালন করেছে। ২০১৪ সালে জাতীয় পার্টি সরকারের অংশ হয়। একই সঙ্গে সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকাও পালন করে, যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক ব্যতিক্রমী ঘটনা হিসেবে আলোচিত হয়।
সংসদে ভূমিকা
এরশাদ কয়েকবার জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। সংসদে তাঁর বক্তব্য প্রায়ই রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হতো। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের উন্নয়ন, কৃষি, অবকাঠামো ও স্থানীয় সরকার বিষয়ে তিনি নিয়মিত বক্তব্য রাখতেন।
রংপুরের মানুষের ‘পল্লীবন্ধু’
রংপুর অঞ্চলে এরশাদ এখনও অনেক মানুষের কাছে ‘পল্লীবন্ধু’ হিসেবে পরিচিত। তাঁর সময়ে রংপুর বিভাগে অসংখ্য সড়ক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকারি স্থাপনা ও উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে বলে স্থানীয়রা দাবি করেন। তাঁর মৃত্যুর পর রংপুরে নিজ পল্লী নিবাসে তাঁকে সমাহিত করা হয়। প্রতি বছর হাজারো মানুষ সেখানে গিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
সমালোচনার জায়গা
এরশাদের শাসনামলকে ঘিরে সমালোচনারও শেষ নেই। সমালোচকদের মতে— সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা গ্রহণ ছিল অসাংবিধানিক। রাজনৈতিক বিরোধীদের দমন-পীড়ন করা হয়েছে। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সীমিত করা হয়েছিল। জরুরি আইন ও সামরিক আইন প্রয়োগ করা হয়েছিল। নির্বাচন নিয়ে নানা প্রশ্ন ও বিতর্ক ছিল। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের ইতিহাসে তাঁর শাসনামলকে গণতন্ত্রের জন্য একটি কঠিন সময় হিসেবেও উল্লেখ করা হয়।
বহুমাত্রিক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব
এরশাদের রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁর অভিযোজন ক্ষমতা। তিনি সামরিক শাসক থেকেও নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি হয়েছেন, আবার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর বিরোধীদলীয় নেতা হয়েছেন। কখনও সরকারের অংশ, কখনও বিরোধী রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ মুখ—সব ভূমিকাতেই তিনি সক্রিয় ছিলেন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এত দীর্ঘ সময় ধরে প্রভাব ধরে রাখতে পেরেছেন—এমন নেতার সংখ্যা খুবই কম।
মৃত্যু
২০১৯ সালের জুন মাসে অসুস্থ হয়ে তিনি সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ভর্তি হন। দীর্ঘ চিকিৎসার পর ১৪ জুলাই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হয় এবং পরে রংপুরে দাফন করা হয়।
৭ম মৃত্যুবার্ষিকীর কর্মসূচি
এবারের ৭ম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে জাতীয় পার্টি রংপুরের পল্লী নিবাসে কোরআনখানি, কবর জিয়ারত, দোয়া মাহফিল ও স্মরণসভার আয়োজন করেছে। দলের চেয়ারম্যান জি এম কাদেরসহ কেন্দ্রীয় নেতারা কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন। পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়েও দলীয় উদ্যোগে দোয়া ও স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
ইতিহাসের বিচারে এরশাদ
হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে এককভাবে মূল্যায়ন করা কঠিন। তাঁর শাসনামলে উন্নয়ন ও প্রশাসনিক কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ যেমন ছিল, তেমনি গণতন্ত্রবিরোধী কর্মকাণ্ড ও সামরিক শাসনের সমালোচনাও ইতিহাসে সমানভাবে লিপিবদ্ধ রয়েছে। তাঁর উত্তরাধিকার তাই দ্বিমাত্রিক—একদিকে উন্নয়নকেন্দ্রিক প্রশাসনিক উদ্যোগের স্মৃতি, অন্যদিকে স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে গণআন্দোলনের ইতিহাস। মৃত্যুর সাত বছর পরও বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাঁর নাম উচ্চারিত হয় কখনও উন্নয়নের প্রসঙ্গে, কখনও গণতান্ত্রিক সংগ্রামের আলোচনায়। রাজনৈতিক ইতিহাসের শিক্ষার্থীদের কাছে তিনি একই সঙ্গে গবেষণার বিষয়, বিতর্কের কেন্দ্র এবং বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ও দলীয় রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। আজ তাঁর ৭ম মৃত্যুবার্ষিকীতে সমর্থকরা তাঁকে উন্নয়নের রূপকার ও পল্লীবন্ধু হিসেবে স্মরণ করছেন। অন্যদিকে সমালোচকেরা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামের ইতিহাস। এই দুই বিপরীত মূল্যায়নের মধ্যেই হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের রাজনৈতিক জীবন বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি স্থায়ী স্থান দখল করে আছে।




