সিলেট প্রতিনিধি : আওয়ামীলীগ সরকারের আমলে ক্ষমতাশীল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারীরা সরকার পতনের পর দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন,আশ্রয় নিয়েছেন কানাডা ও লন্ডনে। এরা পালিয়ে যাওয়াতে সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার মধ্যে সরাসরি সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের কাজের ধীরগতি স্থানীয় জনসাধারণকে ভাবিয়ে তুলেছে। নানা অনিয়ম দুর্নীতি আর ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের গাফিলতিতে এ সড়কের কাজ নিয়ে নানা শংকা দেখা দিয়েছে।
সুনামগঞ্জ সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, দিরাই উপজেলা থেকে শাল্লা উপজেলার দূরত্ব প্রায় ১৯ কিলোমিটার। এই দূরত্ব কমাতে সরকারের জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) ২০২২ সালের ২৮ জুন সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের অনুমোদন দেয়। চার প্যাকেজে সড়ক নির্মাণ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয় ৬২৮ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। ২২ দশমিক ৭৩ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য এবং ৭ দশমিক ৩০ মিটার প্রশন্তের সড়কটিতে ১২টি সেতু ও ১৫টি কালভার্ট নির্মাণের কথা রয়েছে।
জানা যায়, জন্মভূমি নির্মাতা ও নির্মিতি নামের দু’টি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে কাজটি করছে। প্রতিষ্ঠান দু’টির মালিক তিন জন। এর মধ্যে লুৎফুর রহমান বর্তমানে পলাতক। তিনি কানাডায় আছেন। সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন তিনি। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর বেশ কয়েকটি মামলায় তাকে আসামি করা হয়েছে।
একটি বিশ্বস্থ সূত্র জানিয়েছে, গত ১৭ বছরে বিশাল বিত্ত বৈভবের মালিক বনে যাওয়া এই পলাতক নেতা কানাডার ওন্টারিওতে নিজস্ব নিবাস গড়েছেন। দেশে ফিরবেন কিনা তা নিয়েও অনিশ্চয়তা দেখা দিযেছে। অপর মালিক ওহিদুজ্জামান বাবুল। তিনি ব্যবসায়ী হিসাবে পরিচিত হলেও আওয়ামী লীগের বহিষ্কৃত নেতা সাবেক ভিপি সুলতান মোহাম্মদ মনসুরের ছেলের শ্বশুর। এই প্রতিষ্ঠানে আবুল কালাম নামে আরেক জন আছেন। তিনি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। সিলেটের আলোচিত ঠিকাদার লুৎফুর রহমানের অবর্তমানে বাবুল ও কালাম দিরাই-শাল্লা সড়কের চলমান কাজ যেনতেন ভাবে চালিয়ে যাচ্ছেন। ২০২২-২৩ অর্থ বছরে কাজটি শুরু হয়। শেষ করার মেয়াদ ধরা হয়েছিল ২০২৬ সালের জুনে। সওজ বিভাগের বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পটির এখন পর্যন্ত ৫৮ দশমিক ৫৪ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। বাকি ৪১ দশমিক ৪৬ শতাংশ কাজ। দুর্যোগ পরিস্থিতিসহ নানা কারণ দেখিয়ে সময়সীমা ২০২৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। সর্বশেষ এর বরাদ্দ বাড়াতেও সুপারিশ করা হয়েছে।
সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, সড়কের টেলিফোন বাজার অংশে মাটি ফেলছেন শ্রমিকেরা। এখান থেকে তলবাউসী, সন্তোষপুরসহ একাধিক গ্রাম হয়ে পুরোনো সড়কটির অবস্থান। গ্রাম সংলগ্ন পুরোনো সড়ক থেকে টেলিফোন বাজারের বাঁ দিকে নেমে হাওরের মাঝ অংশ দিয়ে সড়ক ও সেতু নির্মাণ কার্যক্রম দেখা গেছে। তবে নকশা পরিপন্থী কাজ করে এখান কার মানুষদের মূল সড়ক থেকে দূরে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে বলে অনেকে অভিযোগ তুলেছেন।
দিরাই উপজেলার তাড়ল ইউনিয়নের তলবাউসী গ্রামের বাসিন্দা মো. আলমগীর মিয়া বলেন, ‘গ্রামের পাশ দিয়ে পুরোনো সড়কের ওপর দিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন করার কথা। কিন্তু টেলিফোন বাজার থেকে হাওরের মাঝ দিয়ে সড়কের কাজ চলছে। বিগত সময়ে এলাকাবাসী প্রতিবাদ করলে অফিসের লোকজন সরেজমিনে এসে নকশা অনুযায়ী কাজের আশ্বাস দিয়েছেন, কিন্তু তা হচ্ছে না। এমনকি সড়কের স্বার্থে অনেকেই জায়গা ছেড়ে দিলেও কেউ ক্ষতিপূরণ পাননি। ভূমি মালিকদের ন্যায্য পাওনা বুঝিয়ে দিতে হবে।
প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখা যায়, হাওরের মাঝ বরাবর একাধিক গ্রামের পাশ দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে নির্মিতব্য সড়কটি। কোনো কোনো অংশে মাটি ফেলা হচ্ছে, ব্লক তৈরি, ব্লক বসানো এবং সেতু নির্মাণের আনুষঙ্গিক কাজ করছেন শ্রমিকেরা।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জন- জেবি কন্সট্রাকশনের দিরাই-শাল্লা আঞ্চলিক মহাসড়ক নির্মাণ প্রকল্পের ব্যবস্থাপক সুখরঞ্জন হালদার গণমাধ্যমকে বলেছেন ‘ভূমি অধিগ্রহণ না হওয়ায় বাধাবিঘ্ন ছিল। এ কারণে কাজ কিছুটা পিছিয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, টেলিফোন বাজার সংলগ্ন সড়কে নকশা পরিবর্তন-সংক্রান্ত ব্যাপারটি কর্তৃপক্ষ সরেজমিনে এসে মীমাংসা করেছে। সব সমস্যা মোকাবিলা করে আমরা কাজটা দ্রুত শেষ করার জন্য চেষ্টা করছি।
সুনামগঞ্জ সড়ক ও জনপথের নির্বাহী প্রকৌশলী ড. মোহাম্মদ আহাদ উল্লাহ গণমাধ্যমকে বলেন, টেলিফোন বাজার থেকে পুরোনো সড়কের ওপর দিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন না করার অভিযোগ সঠিক নয়। বাজার থেকে হাওরমুখী যে কাজ হচ্ছে, সেটা নকশা অনুযায়ীই হচ্ছে। আর ভূমি অধিগ্রহণের বিষয়টি এ প্রকল্পে ধরা হয়নি। ভূমিসংক্রান্ত বিষয়টি পরিমার্জন করে নতুন প্রস্তাবে অন্তর্ভুক্তির সম্ভাবনা আছে।




