বাংলাদেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের রক্তে সিসার উপস্থিতি নিয়ে পরিচালিত একটি জাতীয় জরিপের উপাত্ত বিশ্লেষণে উদ্বেগজনক তথ্য পাওয়া গেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের ১২ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের ৩৮ দশমিক ৫ শতাংশের রক্তে প্রতি ডেসিলিটারে ৫ মাইক্রোগ্রাম বা তার বেশি সিসা বিদ্যমান। অর্থাৎ এই বয়সী প্রতি ১০০ শিশুর মধ্যে প্রায় ৩৯ জনের রক্তে সিসার মাত্রা গবেষণায় নির্ধারিত সীমায় বা তার ওপরে রয়েছে।
গবেষণাটি করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব হেলথ ইকোনমিকসের গবেষক সৈয়দ তৌসিক হোসেন ও মো. ইমাম হাসান। 'সোশ্যাল প্যাটার্নিং অব এলিভেটেড ব্লাড লিড অ্যামাং চিলড্রেন এজড ১২-৫৯ মান্থস ইন বাংলাদেশ: অ্যা ন্যাশনাল ক্রস-সেকশনাল অ্যানালাইসিস অব মিকস ২০২৫' শিরোনামের এই গবেষণাটি চলতি মাসের ১৪ তারিখে চিকিৎসা ও জনস্বাস্থ্যবিষয়ক গবেষণাপত্র প্রকাশের অনলাইন প্ল্যাটফর্ম মেডআর্কাইভে প্রকাশিত হয়েছে। গবেষকেরা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) পরিচালিত ২০২৫ সালের মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (মিকস) থেকে পাওয়া উপাত্ত বিশ্লেষণ করেছেন। জাতিসংঘের শিশু তহবিল-ইউনিসেফের কারিগরি সহায়তায় পরিচালিত এই জরিপে শিশু ও নারীদের স্বাস্থ্য, পুষ্টি, শিক্ষা, জীবনযাত্রা ও পরিবেশগত ঝুঁকিসহ বিভিন্ন বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
মিকসের এই প্রতিবেদনে প্রথমবারের মতো জাতীয় পর্যায়ে পাঁচ বছরের কমবয়সী শিশুদের রক্তে সিসাসহ কয়েকটি ভারী ধাতুর মাত্রা পরীক্ষা করা হয়। গবেষকেরা নতুন করে শিশুদের রক্ত পরীক্ষা করেননি, বরং জরিপে আগে থেকে সংগ্রহ করা রক্ত পরীক্ষার ফল ও পরিবারের আর্থসামাজিক তথ্য ব্যবহার করে নতুন পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণ করেছেন। জরিপে ১২ থেকে ৫৯ মাস বয়সী ১৮ হাজার ৯০৫ শিশুকে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল। তাদের মধ্যে ১০ হাজার ৬২২ শিশুর রক্তে সিসার পরীক্ষার ফল পাওয়া যায়। বিভিন্ন আর্থসামাজিক বৈশিষ্ট্য একসঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে করা মূল বিশ্লেষণে সম্পূর্ণ তথ্য পাওয়া যায় ৯ হাজার ৭১৭ শিশুর। প্রতি ডেসিলিটার রক্তে ৫ মাইক্রোগ্রাম বা তার বেশি সিসা থাকলে তাকে উচ্চমাত্রা হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে দরিদ্র ২০ শতাংশ পরিবারের শিশুদের মধ্যে সিসার উচ্চমাত্রার হার ৩০ দশমিক ২ শতাংশ। বিপরীতে সবচেয়ে ধনী ২০ শতাংশ পরিবারের শিশুদের ক্ষেত্রে এই হার ৫১ দশমিক ৯ শতাংশ। অর্থাৎ ধনী ও দরিদ্র পরিবারের শিশুদের মধ্যে সিসার উচ্চমাত্রার ব্যবধান ২১ দশমিক ৭ শতাংশীয় পয়েন্ট। গবেষকদের মতে, পরিবারের সম্পদের শ্রেণি যত ওপরে উঠেছে, শিশুদের রক্তে সিসার উচ্চমাত্রার হারও তত বেড়েছে। পরিবারের সম্পদ, মায়ের শিক্ষা, ঘরের অবস্থা ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় নেওয়ার পরও এই সম্পর্ক বজায় ছিল। সিসামুক্ত বাংলাদেশ গড়তে ২০৩৫ সালের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে এবং শিশুদের ঝুঁকি কমাতে হবে।
গবেষক সৈয়দ তৌসিক হোসেন ধনী পরিবারের শিশুদের সিসার সংস্পর্শে আসার সম্ভাব্য কারণ ব্যাখ্যা করে জানান, ধনী শিশুরা প্যাকেটজাত খাবার বেশি খেতে পারে। এ ছাড়া তাদের বাসায় আসবাব, দেয়ালের রং ও বিভিন্ন ধরনের তৈজস বেশি থাকে। এসব পণ্যে সিসা থাকতে পারে, ফলে পণ্যগুলোর সংস্পর্শ শিশুদের শরীরে সিসা প্রবেশের সম্ভাব্য পথ হতে পারে। তবে গবেষণায় এসব উৎস আলাদাভাবে পরীক্ষা করা হয়নি বলে সরাসরি সিদ্ধান্ত টানা যায় না। শিশুবিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মোহাম্মদ সহিদুল্লাও মনে করেন, ধনী পরিবারের শিশুদের সিসার সংস্পর্শে আসার সুযোগ তুলনামূলক বেশি হতে পারে। তিনি বলেন, এসব পরিবারের শিশুরা আমদানি করা খেলনা বেশি পায়, বাসায় সাজসজ্জার নানা সামগ্রী থাকে এবং পোলট্রির মুরগিকে দেওয়া খাবারে সিসা থাকতে পারে, যা তারা বেশি খায়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, শিশুদের রক্তে সিসার এমন কোনো মাত্রা জানা নেই, যাকে সম্পূর্ণ নিরাপদ বলা যায়। সিসা মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের বিকাশে ক্ষতি করতে পারে, যার প্রভাবে বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা, মনোযোগ, শেখার ক্ষমতা ও আচরণে সমস্যা দেখা দিতে পারে। এসব ক্ষতির সব সময় তাৎক্ষণিক লক্ষণ থাকে না। শিশুবিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আবিদ হোসেন মোল্লা জানান, উচ্চমাত্রার সিসার সংস্পর্শে গুরুতর উপসর্গ দেখা দিতে পারে, তবে অপেক্ষাকৃত কম মাত্রার সংস্পর্শেও শিশুর বিকাশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সিসা হিমোগ্লোবিনের মাত্রা কমিয়ে দেয় এবং অনুভূতি সৃষ্টিকারী স্নায়ুর কার্যকারিতা ব্যাহত করতে পারে। ১৮ থেকে ২৪ অক্টোবর ডব্লিউএইচওর উদ্যোগে পালিত হচ্ছে ১৪তম আন্তর্জাতিক সিসা বিষক্রিয়া প্রতিরোধ সপ্তাহ, যার প্রতিপাদ্য 'শনাক্তকরণ থেকে প্রতিরোধে'।
বিভাগভেদেও সিসার মাত্রায় বড় পার্থক্য রয়েছে। মিকসের প্রাথমিক ফলাফল অনুযায়ী, ঢাকায় ১২ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের ৬৫ দশমিক ২ শতাংশের রক্তে সিসার উচ্চমাত্রা পাওয়া গেছে। সিলেটে এ হার ৪৬ দশমিক ৭ শতাংশ এবং চট্টগ্রামে ৪২ দশমিক ১ শতাংশ। অন্যদিকে বরিশালে এ হার ২৯ শতাংশ, ময়মনসিংহে ৩০ দশমিক ৬ শতাংশ, খুলনায় ১৭ দশমিক ৮ শতাংশ, রাজশাহীতে ১৫ দশমিক ৯ শতাংশ এবং রংপুরে ১৯ দশমিক ৬ শতাংশ। গবেষকদের সমন্বিত পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণেও বিভাগভেদে পার্থক্য পাওয়া গেছে, যেখানে বরিশালকে তুলনার ভিত্তি ধরে বিশ্লেষণে ঢাকায় শিশুদের রক্তে সিসার উচ্চমাত্রার সঙ্গে বেশি সম্পর্ক এবং রাজশাহীতে কম সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
অনেক সময় হিমোগ্লোবিনের মাত্রাও কমে যায়।অধ্যাপক আবিদ হোসেন মোল্লা ও অধ্যাপক মোহাম্মদ সহিদুল্লা দুজনই জানিয়েছেন, আগের তুলনায় স্নায়ুগত সমস্যায় আক্রান্ত শিশু তাঁদের কাছে বেশি আসছে।.বিষাক্ত প্যারাকোয়াট আমদানি নিবন্ধন বন্ধ, গ্লাইফোসেট নিয়ে সিদ্ধান্ত হলো না.বাংলাদেশে শিশুদের রক্তে সিসার উপস্থিতি এবং বিকাশের ওপর এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে আগেও গবেষণা হয়েছে।২০১৬ সালে এনভায়রনমেন্টাল হেলথ সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় সিরাজদিখান ও পাবনার ৫২৪ শিশুর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়।
এর ভিত্তিতে প্রতিটি শিশুর বিকাশজনিত সমস্যার একমাত্র কারণ সিসা, এমন সিদ্ধান্ত দেওয়া যায় না।২০২০ সালে জার্নাল অব নিউরোডেভেলপমেন্টাল ডিজঅর্ডারস সাময়িকীতে প্রকাশিত বাংলাদেশের ৭৩৪ শিশুর আরেকটি গবেষণায় জন্মের সময় নাড়ির রক্তে সিসার মাত্রা এবং দুই থেকে তিন বছর বয়সে তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ বিশ্লেষণ করা হয়।এতে অপুষ্টিজনিত খর্বাকৃতির শিশুদের ক্ষেত্রে গর্ভকালীন সিসার সংস্পর্শের সঙ্গে বুদ্ধিবৃত্তিক স্কোর কমার সম্পর্ক পাওয়া যায়।




