যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচন শেষ হওয়ার পরই ইরানে বড় পরিসরে নতুন সামরিক হামলা চালানোর জোর পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী। প্রস্তাবিত এই যৌথ হামলায় ইরানের পারমাণবিক কেন্দ্র, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন মজুত এবং জ্বালানি অবকাঠামোকে মূল নিশানা করা হতে পারে। দুই দেশের সামরিক বাহিনী ইতোমধ্যে এই আক্রমণের সার্বিক প্রস্তুতি জোরদার করেছে। দ্য নিউইয়র্ক টাইমস-এর গত বুধবারের এক প্রতিবেদনে মার্কিন কর্মকর্তা ও সামরিক পরিকল্পনা সম্পর্কে অবগত ব্যক্তিদের সূত্রে এ খবর জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্বল্প সময়ের মধ্যে একটি তীব্র ও ধ্বংসাত্মক হামলা চালানোর কৌশল নিয়ে আলোচনা চলছে। চলতি সপ্তাহেই বিষযটি নিয়ে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠক করেছেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। যুক্তরাষ্ট্রের কিছু পরিকল্পনাকারীর মতে, টানা তিন দিন ধরে এই তীব্র হামলা চালানো হলে ইরানের অর্থনীতি মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়বে, যা শেষ পর্যন্ত তেহরানকে পরমাণু ও কূটনৈতিক আলোচনায় ছাড় দিতে বাধ্য করবে। তবে এই হামলায় চূড়ান্ত অনুমোদন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দেবেন কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
এর আগে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ইরানে একাধিক বড় যৌথ হামলা চালিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। বিশেষ করে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া অভিযানে ইরানের সরকার পরিবর্তনের লক্ষ্যও ছিল। কিন্তু প্রায় আট মাসের সংঘাত, কড়া নিষেধাজ্ঞা এবং মার্কিন নৌ অবরোধের পরও ইরানের সরকার ক্ষমতায় টিকে রয়েছে এবং পরমাণু বিষয়ে কোনো নতি স্বীকার করেনি। উপরন্তু, পূর্বের সেই যুদ্ধ বিশ্বজুড়ে তেলের দাম ও মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে দেয়, মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তাকে নড়বড়ে করে তোলে এবং মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা অস্ত্রের মজুতে টান ফেলে।
চলতি বছরে একাধিকবার বড় আক্রমণের প্রস্তাব আটকে দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। এমনকি গত অক্টোবরের শুরুতে সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হওয়া সত্ত্বেও শেষ মুহূর্তে তিনি আক্রমণ স্থগিত করেছিলেন। তবে আগামী নভেম্বরের শুরুর দিকেই মধ্যপ্রাচ্যে পূর্ণ সামরিক প্রস্তুতি গুছিয়ে আনছে ওয়াশিংটন। ওই সময়ের মধ্যে অঞ্চলে তিনটি বিমানবাহী রণতরি, যুদ্ধবিমান, বিশেষ বাহিনী এবং হাজার হাজার মেরিন সেনা মোতায়েন সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে।
হামলার মূল পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে পাহাড়ের গভীরে অবস্থিত ইরানের গোপন ‘পিক্যাক্স’ পারমাণবিক কেন্দ্রসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনা। ট্রাম্প সেখানে ২২ হাজার পাউন্ড ওজনের ‘মাদার অব অল বম্বস’ ব্যবহারের বিষয়টি বিবেচনায় রাখছেন। তবে অস্ত্রবিশেষজ্ঞদের মতে, ভূখণ্ডের উপরিভাগে বিস্ফোরিত হওয়া এই বোমা দিয়ে মাটির গভীরে তৈরি পারমাণবিক কেন্দ্র ধ্বংস করা প্রায় অসম্ভব। এছাড়া জ্বালানি অবকাঠামোর শোধনাগারগুলো লক্ষ্যবস্তু করার প্রস্তাব থাকলেও তেলের দাম আবার লাফিয়ে বাড়ার আশঙ্কায় অনেক মার্কিন কর্মকর্তা এগুলো এড়িয়ে চলার পক্ষে।
ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও এই সামরিক পরিকল্পনায় প্রভাব ফেলছে। আগামী ২৭ অক্টোবর ইসরায়েলে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এতে নেতানিয়াহু পরাজিত হলে নতুন প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব না নেওয়া পর্যন্ত তিনি তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে থাকবেন, যা নতুন যুদ্ধ শুরু করাকে জটিল করবে। তবে কিছু বিশ্লেষকের মতে, যৌথ হামলার আশঙ্কাকে পুঁজি করে বিরোধীদের সঙ্গে ঐক্য সরকার গঠনের চেষ্টা করতে পারেন তিনি। ইসরায়েলি রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাজাল মুয়ালেম জানান, নেতানিয়াহু জরুরি সরকার গঠনের আহ্বান জানাতে পারেন, যদিও এবার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের গভীর সন্দেহের মুখেই পড়তে হবে তাঁকে।
নতুন করে সামরিক সংঘাতের আভাস পেয়ে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান। ইরানি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন হামলা হলে উপসাগরীয় অঞ্চলের বাণিজ্যিক জাহাজ, জ্বালানি অবকাঠামো, ডেটা সেন্টার এবং সমুদ্রতলের ইন্টারনেট কেবলেও পাল্টা আঘাত হানা হতে পারে। ইতিমধ্যে ইয়েমেনের হুতিদের অব্যাহত হামলার মধ্যে গত বুধবার সৌদি আরব থেকে জরুরি দায়িত্বের বাইরে থাকা সরকারি কর্মী ও তাঁদের পরিবারকে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে ওয়াশিংটন। তেহরানভিত্তিক বিশ্লেষক পেইমান সালেহি বলেন, যুদ্ধ শিখিয়েছে যে ট্রাম্পকে চাপে ফেলার সেরা পথ তেলের দাম বাড়ানো, কারণ এতে সাধারণ আমেরিকানরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বর্তমানে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও কৌশলগত হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেহরানের কূটনৈতিক আলোচনা চলছে। তেহরান চায় আগে হরমুজে জাহাজ চলাচল চুক্তি হোক, তারপর পারমাণবিক বিষয়টি আসুক; তবে ওয়াশিংটন শুরু থেকেই দুটিকে একসাথে রাখতে চায়। সাবেক মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা ডানা স্ট্রাউল প্রশ্ন তুলেছেন, অঞ্চলটি যখন আরও সংঘাতপূর্ণ হচ্ছে, তখন নতুন যুদ্ধের পরিণতি কী হবে তার কোনো বিশ্বাসযোগ্য উত্তর ট্রাম্প বা নেতানিয়াহু দিতে পারেননি। অন্যদিকে ইরানি আলোচক দলের উপদেষ্টা মাহদি মোহাম্মাদি তিন দিনে যুদ্ধ শেষ করার পরিকল্পনাকে ‘আকাশকুসুম কল্পনা’ আখ্যা দিয়ে সতর্ক করেছেন যে, ইরানের পাল্টা হামলা হবে আরও তীব্র, সৃজনশীল ও ভিন্ন ধাঁচের।




