রাজধানীর গেন্ডারিয়া রেলস্টেশনসংলগ্ন দয়াগঞ্জ ঘুণ্টিঘর এলাকায় আগ্নেয়াস্ত্র হাতে একটি মাদকবিরোধী অভিযানে অংশ নিয়ে তীব্র আলোচনার জন্ম দিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ও ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ইশরাক হোসেন। শনিবার বিকেলে গাড়ি থেকে নেমে পিস্তল উঁচিয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের ধরার নির্দেশ দেওয়ার একটি ভিডিও তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এর পরপরই একজন প্রতিমন্ত্রীর এভাবে প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শন ও অভিযান চালানো নিয়ে নানা মহল থেকে সমালোচনা ও আইনি প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন গাড়ি থেকে নেমেই হাতে থাকা আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে ‘এই ধর ধর ধর…’ বলে হাঁক দেন। এ সময় তাঁর পাশে থাকা এক ব্যক্তি চিৎকার করে বলেন, ‘একেবারে গুলি করে দেব।’ প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গী ও দেহরক্ষীরা রেললাইনের পাশে থাকা কয়েকজনকে ধরতে ছুটে যান। অভিযানে আটক এক তরুণ নিজেকে ‘গরিব মানুষ’ দাবি করে কিছু করেননি বলে আকুতি জানালে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘পুলিশ আসবে, তারপর কথা হবে।’ ওই ভিডিওতে প্রতিমন্ত্রীর নিজের নিয়োগ করা দুই দেহরক্ষী তোফাজ্জল হোসেন ও লাভলুর হাতেও অস্ত্র দেখা যায় এবং সরকারি দেহরক্ষীকে অস্ত্র তাক করতে ও এক তরুণকে লাথি মারতে দেখা গেছে। ভিডিওটির কিছু অংশে প্রতিমন্ত্রীর হাতের পিস্তলটি ব্লার বা অস্পষ্ট করা হলেও অন্য অংশে তা স্পষ্টই দৃশ্যমান ছিল।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকা ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক পাভেল শিকদার জানান, শনিবার বেলা তিনটা থেকে সাড়ে তিনটার দিকে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে তারা সেখানে যান। পুলিশকে খবর দেওয়া হলেও তাদের পৌঁছাতে দেরি হয়। পরে 'ইশরাকের অ্যাকশন: মাদক আস্তানা গুঁড়িয়ে বিক্রেতাদের পুলিশে সোপর্দ' শিরোনামে ভিডিওটি ১৭ অক্টোবর ২০২৬ তারিখের উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রীর ৪০ লাখ অনুসারীর ফেসবুক পেজে প্রকাশ করা হয়। সেখানে আটক ব্যক্তিদের পুলিশের কাছে তুলে দিতে দেখা গেলেও পরবর্তীতে ভিডিওটি পেজ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। পাভেল শিকদার জানান, ঘটনাস্থলে কোনো গুলি চালানো হয়নি এবং তরুণকে লাথি দেওয়া ব্যক্তি ছিলেন প্রতিমন্ত্রীর সরকারি দেহরক্ষী।
এই ঘটনার পর একটি রাষ্ট্রীয় পদে থাকা ব্যক্তি কর্তৃক এভাবে অস্ত্র প্রদর্শন এবং আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে চারটি প্রধান প্রশ্ন ওঠে—অস্ত্রটি বৈধ কি না, বৈধ হলেও প্রতিমন্ত্রী অস্ত্র উঁচিয়ে এমন অভিযান চালাতে পারেন কি না, পুলিশ ব্যবস্থা না নিয়ে মন্ত্রীকে কেন নামতে হবে এবং বিদ্যমান ব্যবস্থা সংস্কার না করে এ ধরনের পদক্ষেপ কতটুকু গ্রহণযোগ্য। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ২০২৫ সালের আগ্নেয়াস্ত্র বহন ও ব্যবহার নীতিমালার ২৫(ক) অনুচ্ছেদে স্পষ্ট বলা আছে, লাইসেন্সপ্রাপ্ত অস্ত্র কেবল আত্মরক্ষার উদ্দেশ্যে বহন করা যাবে, যা অন্য কারও মনে ভীতি বা বিরক্তি সৃষ্টি করতে পারে এমনভাবে প্রদর্শন করা বেআইনি। এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শরীফ ভূঁইয়া জানান, সরকারের কাজ আদেশ দেওয়া এবং পুলিশের কাজ তা বাস্তবায়ন করা। একজন প্রতিমন্ত্রী যেভাবে অস্ত্র প্রদর্শন করে অভিযান পরিচালনা করেছেন, তা সম্পূর্ণ বেআইনি।
সমালোচনার জবাবে প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন দাবি করেন, তাঁর হাতের অস্ত্রটি সম্পূর্ণ বৈধ। নির্বাচনের হলফনামায় এই অস্ত্রের উল্লেখ না থাকা নিয়ে তিনি বলেন, ২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর শরীফ ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর তিনি এই অস্ত্রটি কেনেন। ওই বছরের ২৯ ডিসেম্বর মনোনয়নপত্র জমাদানের শেষ তারিখ এবং ২৮ ডিসেম্বর তিনি জমা দেওয়ায় তা প্রদর্শনের সুযোগ ছিল না। স্বীয় নির্বাচনী এলাকার গেন্ডারিয়া এলাকায় দীর্ঘদিনের মাদক সমস্যার কথা উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, স্থানীয়দের বারবার অভিযোগে তিনি ৩০-৪০ বার পুলিশের সঙ্গে বৈঠক করেছেন এবং পুলিশ জনবল ও গাড়ির সংকটের অজুহাত দিয়েছে। এছাড়া জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা এবং অতীতে সেখানে অভিযানে পুলিশ সদস্য গুলিবিদ্ধ হওয়ার কারণে নিজের সুরক্ষায় তিনি অস্ত্র সাথে রেখেছিলেন। তিনি বলেন, 'আমি তো আর গুলি করি নাই, ওটা নিয়ে কাউকে ভয়ও দেখাই নাই।' তবে ভিডিওতে শিশুরা উপস্থিত থাকা অবস্থাতেই তাঁকে অস্ত্র তাক করতে দেখা গেছে। অন্যদিকে গেন্ডারিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুজ্জামান প্রতিমন্ত্রীর অভিযোগ প্রসঙ্গে জানান, গত ১১ অক্টোবরই তারা ডিবি ও এসআরবিসহ ৩০০ পুলিশ সদস্য নিয়ে সেখানে অভিযান চালিয়েছেন এবং প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রেখেই হালনাগাদ তথ্য জানানো হয়।




