জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়া এবং ধানের চড়া দাম ও মৌসুমি সংকটের যৌথ প্রভাবে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চালের দাম বেড়েছে। দীর্ঘ ধরে টানা উচ্চ মূল্যস্ফীতির বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় এই খাদ্যের দরবৃদ্ধি ভোক্তাদের ওপর নতুন করে আর্থিক চাপ সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর মাসে দেশে ১২ মাসের গড় মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৬৫ শতাংশে। বাজারে চালসহ অন্যান্য নিত্যপণ্যের দাম বাড়তে থাকায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।

রাজধানীর বিভিন্ন পাইকারি ও খুচরা বাজার ঘুরে দেখা গেছে, মানভেদে সরু চাল প্রতি কেজি ৭৪ থেকে ৭৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা মাত্র এক সপ্তাহ আগেও ছিল ৭২ টাকা। মাঝারি মানের চালের দর কেজিপ্রতি ৫৫-৬২ টাকা থেকে বেড়ে ৫৮ থেকে ৬৫ টাকা হয়েছে। তবে মোটা চালের দাম অপরিবর্তিত থেকে প্রতি কেজি ৫০ থেকে ৫৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্যের সঙ্গে বাজারের এই চিত্রের অমিল পাওয়া গেছে। টিসিবির মতে, গত এক সপ্তাহে কোনো চালের দাম বাড়েনি, বরং সরু চালের দাম কেজিতে ১ দশমিক ২৭ শতাংশ কমেছে। যদিও সংস্থাটির তথ্যে মাসের ব্যবধানে মাঝারি চালের দাম ২ দশমিক ৫০ শতাংশ বাড়ার কথা উল্লেখ রয়েছে। টিসিবি ও গণমাধ্যমের হিসেব অনুযায়ী, গত বছরের এই সময়ে মোটা চালের কেজি ছিল ৫৫-৬৫ টাকা এবং সরু চাল বিক্রি হয়েছিল ৭৫-৮৫ টাকায়।

মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের পাইকারি চাল ব্যবসায়ী মোহাম্মদ শাওন জানান, সরু চালের পাইকারি দর কেজিতে ১ টাকা বেড়ে ৬৬ টাকা এবং মাঝারি চালের দাম ১ টাকা ৫০ পয়সা বেড়ে ৪৮ টাকা ৫০ পয়সা হয়েছে। বর্তমানে ২৫ কেজির এক বস্তা সরু চাল ১ হাজার ৬৫০ টাকা এবং মাঝারি চাল ১ হাজার ২১২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। শাওন আরও জানান, জ্বালানির দাম বাড়ার পর কুষ্টিয়া থেকে ঢাকায় চালের এক ট্রাক আনতে ভাড়া আগে ২০ হাজার টাকা লাগলেও এখন ২৪ হাজার টাকা লাগছে। ওই বাজারের পাইকারি বিক্রেতা মামুনুর রশিদ জানান, আমন ধান কাটা শুরু হলেও মৌসুম শেষের প্রভাব দাম বাড়ার একটি কারণ, তবে গত বছরের তুলনায় সার্বিক দাম এখনও কিছুটা কম। কারওয়ান বাজারের বিক্রেতা মহিউদ্দিন সরকার সাইফুলও পরিবহন ও ধানের বাড়তি দামকেই প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

বাজারে চালের দাম বাড়ার এই পরিস্থিতিতে কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন খাদ্য প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী। তিনি পরিষ্কার জানিয়ে দেন, 'এখন চালের দাম বাড়ার কোনো কারণই নেই। আমি মাঠপর্যায়ে খোঁজ নিচ্ছি এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্টদের বিষয়টি জানাচ্ছি। এ বিষয়ে সরকার কঠোর।' প্রতিমন্ত্রী আরও উল্লেখ করেন, মিলমালিকেরা সরকারকে চাল সরবরাহ করতে চাইলেও এই মুহূর্তে সরকার চাল সংগ্রহ করবে না; কিছুদিন পর তাদের কাছ থেকে চাল নেওয়া হবে।

অন্য দিকে অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা অসাধু চক্রের সুযোগ নেওয়ার বিষয়টি সামাল দেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন। সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো প্রফেসর ড. মোস্তাফিজুর রহমান জানান, খরচ বৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব মানুষের জীবিকার ওপর পড়ে, যার ফলে দরিদ্ররা আরও গরিব হচ্ছে এবং নতুন দারিদ্র্য তৈরি হচ্ছে। তিনি নিত্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখার এবং নিম্ন আয়ের মানুষকে রক্ষায় সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতা বাড়ানোর আহ্বান জানান। কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এএইচএম সফিকুজ্জামান বলেন, জ্বালানির দামে পরিবহন খরচ কিছুটা বাড়লেও সেটাকে অসিলা করে ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত দাম বাড়াতে পারেন না। বাজার মনিটরিং ব্যবস্থার দুর্বলতার সুযোগ ব্যবসায়ীরা নিচ্ছেন বলে তিনি মনিটরিং জোরদারের দাবি জানান।

ঢাকার চালের বাজারে সরবরাহকারী প্রধান দুই অঞ্চল কুষ্টিয়া ও নওগাঁর চালকল মালিকরাও দরবৃদ্ধির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। বাংলাদেশ অটো মেজর অ্যান্ড হাসকিং মিলমালিক সমিতি কুষ্টিয়া শাখার সাধারণ সম্পাদক জয়নাল আবেদীন প্রধান জানান, গত এক মাসে মিলগেটে চালের দাম কেজিতে ১-২ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। বর্তমানে মিলগেটে সরু চাল বিক্রি হচ্ছে ৫৫-৬৭ টাকা কেজি দরে। এ ছাড়া ধানের দর মণপ্রতি ১,১২০ টাকা থেকে বেড়ে ১,২৪০ টাকা হওয়া এবং শুকানোর কারণে ধানের আর্দ্রতা ও ওজন কমে যাওয়াকে দরবৃদ্ধির কারণ বলেন তিনি। নওগাঁ ধান-চাউল আড়তদার ও ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি নিরোদ বরণ সাহা জানান, পাঁচ দিনের ব্যবধানে সরু চালের পাইকারি দাম মণপ্রতি ৩০-৫০ টাকা বেড়েছে। বর্তমানে প্রতি মণ সরু চাল (৩৭.৩২ কেজি) ২,০৫০ থেকে ২,০৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা মৌসুম শেষের স্বাভাবিক নিয়মে কেজিতে ১ থেকে দেড় টাকা বেশি।

চাল উৎপাদনের বড় কেন্দ্র কুষ্টিয়ার খাজানগরে গত ১৭ সেপ্টেম্বর চালের দাম কেজিতে ২-৩ টাকা এবং খুচরা বাজারে ৪-৫ টাকা বাড়লে জেলা প্রশাসন মিলমালিকদের সঙ্গে বৈঠকে বসে। সে সময় মিলগেট মূল্য কেজিতে ১ টাকা কমানো হয় এবং দুই সপ্তাহ দাম স্থিতিশীল রাখার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের চারদিনের মাথায় খাজানগরে মিনিকেট চালের দর মিলগেটে ৬৮ টাকা থেকে বেড়ে ৭০ ও পরে ৭২ টাকা হয় এবং কুষ্টিয়া পৌর বাজারে খুচরায় ৭৪ টাকায় উঠে যায়। দেশ এগ্রো লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল খালেক ও স্থানীয় মিল মালিকেরা জানান, ধান, শ্রমিকের মজুরি, বিদ্যুৎ, প্যাকেজিং ও জ্বালানিসহ সার্বিক খরচ বাড়ায় চালের দর সমন্বয় করতে বাধ্য হয়েছেন তারা। কারওয়ান বাজারের দোকান ব্যবস্থাপক শফিকুল ইসলাম ও অন্যান্য ব্যবসায়ীরা জানান, দিনাজপুর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে প্রতি ট্রাকে যথাক্রমে অতিরিক্ত ৩,০০০ টাকা ও ২,০০০ টাকা ভাড়া দিতে হওয়ায় পাইকারিতে কেজিতে ৫০ পয়সা থেকে ১ টাকা দর বাড়াতে হচ্ছে।

চালের বাজার নিয়ে ভোক্তারা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। মিরপুরের বাসিন্দা মারুফ জানান, প্রতি মাসেই কোনো না কোনো পণ্যের দাম বাড়ায় সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। নতুন বাজারের ক্রেতা নওশাদ আলী জানান, সেপ্টেম্বরের শুরুতে ৬০ টাকায় কেনা আটাশ চাল বর্তমানে ৬৪ টাকায় কিনতে হচ্ছে, যেখানে বিক্রেতারা অতিরিক্ত ট্রাকভাড়ার অজুহাত দিচ্ছেন।

চালের পাশাপাশি ঢাকার বাজারে সবজির দামও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। অধিকাংশ সবজি প্রতি কেজি ৭০ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। নতুন আসা শীতকালীন সবজি শিমের কেজি ১৫০ টাকা, ফুলকপি প্রতি পিস ৭০ টাকা এবং মূলা কেজিপ্রতি ৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে পেঁপে কিছুটা কম দামে কেজিপ্রতি ৩০ টাকায় মিলছে। বাজারে লম্বা বেগুন ১০০ টাকা, গোল বেগুন ১২০ টাকা, টমেটো ১২০-১৪০ টাকা, বরবটি, ঝিঙা ও করলা ৮০ টাকা, লাউ ৪০-৬০ টাকা এবং কচুরমুখি ৮০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। সাধারণ শসা ৫০-৬০ টাকা হলেও দেশি শসা ৮০-১ ১০০ টাকা। অবশ্য সরবরাহ বৃদ্ধি পাওয়ায় কিছুদিন আগের ২০০ টাকার কাঁচা মরিচ কমে ১২০-১৪০ টাকা কেজিতে নেমে এসেছে। নবোদয় বাজারের সবজি ক্রেতা আবু সাঈদ জানান, গুটি কতক সবজি কিনতেই বড় অংকের টাকা চলে যাচ্ছে, যা সংসারের বাজেট এলোমেলো করে দিচ্ছে।

আমিষের বাজারে ব্রয়লার ও সোনালি মুরগির দাম তুলনামূলক স্থিতিশীল রয়েছে। ব্রয়লার মুরগি প্রতি কেজি ১৮০ টাকা এবং সোনালি মুরগি ৩১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গরু মাংস বিক্রি হচ্ছে আগের মতোই প্রতি কেজি ৮০০ টাকায়। তবে ফার্মের মুরগির ডিমের বাজারে বাড়তি দর অব্যাহত রয়েছে; বাজারে প্রতি ডজন ডিম ১৫৫ থেকে ১৬০ টাকা এবং পাড়া-মহল্লার দোকানে চারটি ৫৫ টাকা হিসেবে ডজন ১৬৫ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে। ব্রয়লার বিক্রেতা তারেক হোসেন জানান, ব্রয়লারের দাম সপ্তাহের ব্যবধানে ১০ টাকা ওঠানামা করছে।

মাছের বাজারেও ক্রেতাদের চড়া দাম গুনতে হচ্ছে। বর্তমানে তেলাপিয়া ২৫০-২৬০ টাকা, পাঙাশ ২২০-২৩০ টাকা, রুই-কাতলা ৩৮০-৪২০ টাকা, পাবদা ৩৫০-৪০০ টাকা, বড় রুই ৪৫০- ৫০০ টাকা, চাষের কই ৩০০ টাকা, পোয়া ২৬০ টাকা এবং চাষের শিং ৩০০-৪৫০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। আকারভেদে চিংড়ির দাম ১,০০০ থেকে ১,৩০০ টাকা কেজি। মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের মাছ বিক্রেতা রমিজ উদ্দিন জানান, শুক্রবার চাহিদা বেশি থাকায় দাম কিছুটা বাড়ে এবং বর্তমানে ২০০ টাকার নিচে পাঙাশসহ খুব কম মাছই বাজারে পাওয়া যায়।

রাজধানীর কয়েকটি পাইকারি ও খুচরা বাজার ঘুরে দেখা গেছে, সরু চাল কেজিপ্রতি ৭৪-৭৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এক সপ্তাহ আগেও এর দাম ছিল ৭২ টাকা। মাঝারি মানের চালের দাম ৫৫-৬২ টাকা থেকে বেড়ে এখন ৫৮-৬৫ টাকা। তবে মোটা চালের দাম অপরিবর্তিত আছে, কেজি ৫০-৫৫ টাকা। বাজারের চিত্রের সঙ্গে মিল নেই সরকারি তথ্যের। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য বলছে, গত এক সপ্তাহে কোনো ধরনের চালেরই দাম বাড়েনি। উল্টো সরু চালের দাম কেজি প্রতি ১ দশমিক ২৭ শতাংশ কমেছে। অবশ্য গত এক মাসের ব্যবধানে মাঝারি মানের চালের দাম কেজি প্রতি ২ দশমিক ৫০ শতাংশ বেড়েছে বলে টিসিবির তথ্যে দেখা গেছে। গণমাধ্যমের প্রতিবেদন ও টিসিবির তথ্য অনুযায়ী, গত বছর এ সময় মোটা চাল কেজিপ্রতি ৫৫-৬৫ টাকায় বিক্রি হয়েছিল। মান অনুযায়ী সরু চালের দাম ছিল ৭৫-৮৫ টাকা।

মাছের বাজারেও স্বস্তি নেই মাছের বাজারেও ক্রেতাদের বেশি দাম গুনতে হচ্ছে। তেলাপিয়া কেজিপ্রতি ২৫০-২৬০ টাকা, পাঙাশ ২২০-২৩০ টাকা ও রুই-কাতলা ৩৮০ থেকে ৪২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। চিংড়ির দাম আকার ও মানভেদে কেজিতে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা। এ ছাড়া পাবদা ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা ও বড় রুই ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। চাষের কই পাওয়া যাচ্ছে ৩০০ টাকায়, পোয়া ২৬০ টাকা কেজি দরে। চাষের শিং মাছ আকারভেদে ৩০০ থেকে ৪৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মাঝারি আকারের রুই কেনা যাচ্ছে ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা কেজি দরে।

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়া এবং ধানের চড়া দাম ও মৌসুমি সংকটের যৌথ প্রভাবে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চালের দাম বেড়েছে। দীর্ঘ ধরে টানা উচ্চ মূল্যস্ফীতির বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় এই খাদ্যের দরবৃদ্ধি ভোক্তাদের ওপর নতুন করে আর্থিক চাপ সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর মাসে দেশে ১২ মাসের গড় মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৬৫ শতাংশে। বাজারে চালসহ অন্যান্য নিত্যপণ্যের দাম বাড়তে থাকায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।

রাজধানীর বিভিন্ন পাইকারি ও খুচরা বাজার ঘুরে দেখা গেছে, মানভেদে সরু চাল প্রতি কেজি ৭৪ থেকে ৭৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা মাত্র এক সপ্তাহ আগেও ছিল ৭২ টাকা। মাঝারি মানের চালের দর কেজিপ্রতি ৫৫-৬২ টাকা থেকে বেড়ে ৫৮ থেকে ৬৫ টাকা হয়েছে। তবে মোটা চালের দাম অপরিবর্তিত থেকে প্রতি কেজি ৫০ থেকে ৫৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্যের সঙ্গে বাজারের এই চিত্রের অমিল পাওয়া গেছে। টিসিবির মতে, গত এক সপ্তাহে কোনো চালের দাম বাড়েনি, বরং সরু চালের দাম কেজিতে ১ দশমিক ২৭ শতাংশ কমেছে। যদিও সংস্থাটির তথ্যে মাসের ব্যবধানে মাঝারি চালের দাম ২ দশমিক ৫০ শতাংশ বাড়ার কথা উল্লেখ রয়েছে। টিসিবি ও গণমাধ্যমের হিসেব অনুযায়ী, গত বছরের এই সময়ে মোটা চালের কেজি ছিল ৫৫-৬৫ টাকা এবং সরু চাল বিক্রি হয়েছিল ৭৫-৮৫ টাকায়।

মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের পাইকারি চাল ব্যবসায়ী মোহাম্মদ শাওন জানান, সরু চালের পাইকারি দর কেজিতে ১ টাকা বেড়ে ৬৬ টাকা এবং মাঝারি চালের দাম ১ টাকা ৫০ পয়সা বেড়ে ৪৮ টাকা ৫০ পয়সা হয়েছে। বর্তমানে ২৫ কেজির এক বস্তা সরু চাল ১ হাজার ৬৫০ টাকা এবং মাঝারি চাল ১ হাজার ২১২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। শাওন আরও জানান, জ্বালানির দাম বাড়ার পর কুষ্টিয়া থেকে ঢাকায় চালের এক ট্রাক আনতে ভাড়া আগে ২০ হাজার টাকা লাগলেও এখন ২৪ হাজার টাকা লাগছে। ওই বাজারের পাইকারি বিক্রেতা মামুনুর রশিদ জানান, আমন ধান কাটা শুরু হলেও মৌসুম শেষের প্রভাব দাম বাড়ার একটি কারণ, তবে গত বছরের তুলনায় সার্বিক দাম এখনও কিছুটা কম। কারওয়ান বাজারের বিক্রেতা মহিউদ্দিন সরকার সাইফুলও পরিবহন ও ধানের বাড়তি দামকেই প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

বাজারে চালের দাম বাড়ার এই পরিস্থিতিতে কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন খাদ্য প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী। তিনি পরিষ্কার জানিয়ে দেন, 'এখন চালের দাম বাড়ার কোনো কারণই নেই। আমি মাঠপর্যায়ে খোঁজ নিচ্ছি এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্টদের বিষয়টি জানাচ্ছি। এ বিষয়ে সরকার কঠোর।' প্রতিমন্ত্রী আরও উল্লেখ করেন, মিলমালিকেরা সরকারকে চাল সরবরাহ করতে চাইলেও এই মুহূর্তে সরকার চাল সংগ্রহ করবে না; কিছুদিন পর তাদের কাছ থেকে চাল নেওয়া হবে।

অন্য দিকে অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা অসাধু চক্রের সুযোগ নেওয়ার বিষয়টি সামাল দেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন। সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো প্রফেসর ড. মোস্তাফিজুর রহমান জানান, খরচ বৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব মানুষের জীবিকার ওপর পড়ে, যার ফলে দরিদ্ররা আরও গরিব হচ্ছে এবং নতুন দারিদ্র্য তৈরি হচ্ছে। তিনি নিত্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখার এবং নিম্ন আয়ের মানুষকে রক্ষায় সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতা বাড়ানোর আহ্বান জানান। কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এএইচএম সফিকুজ্জামান বলেন, জ্বালানির দামে পরিবহন খরচ কিছুটা বাড়লেও সেটাকে অসিলা করে ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত দাম বাড়াতে পারেন না। বাজার মনিটরিং ব্যবস্থার দুর্বলতার সুযোগ ব্যবসায়ীরা নিচ্ছেন বলে তিনি মনিটরিং জোরদারের দাবি জানান।

ঢাকার চালের বাজারে সরবরাহকারী প্রধান দুই অঞ্চল কুষ্টিয়া ও নওগাঁর চালকল মালিকরাও দরবৃদ্ধির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। বাংলাদেশ অটো মেজর অ্যান্ড হাসকিং মিলমালিক সমিতি কুষ্টিয়া শাখার সাধারণ সম্পাদক জয়নাল আবেদীন প্রধান জানান, গত এক মাসে মিলগেটে চালের দাম কেজিতে ১-২ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। বর্তমানে মিলগেটে সরু চাল বিক্রি হচ্ছে ৫৫-৬৭ টাকা কেজি দরে। এ ছাড়া ধানের দর মণপ্রতি ১,১২০ টাকা থেকে বেড়ে ১,২৪০ টাকা হওয়া এবং শুকানোর কারণে ধানের আর্দ্রতা ও ওজন কমে যাওয়াকে দরবৃদ্ধির কারণ বলেন তিনি। নওগাঁ ধান-চাউল আড়তদার ও ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি নিরোদ বরণ সাহা জানান, পাঁচ দিনের ব্যবধানে সরু চালের পাইকারি দাম মণপ্রতি ৩০-৫০ টাকা বেড়েছে। বর্তমানে প্রতি মণ সরু চাল (৩৭.৩২ কেজি) ২,০৫০ থেকে ২,০৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা মৌসুম শেষের স্বাভাবিক নিয়মে কেজিতে ১ থেকে দেড় টাকা বেশি।

চাল উৎপাদনের বড় কেন্দ্র কুষ্টিয়ার খাজানগরে গত ১৭ সেপ্টেম্বর চালের দাম কেজিতে ২-৩ টাকা এবং খুচরা বাজারে ৪-৫ টাকা বাড়লে জেলা প্রশাসন মিলমালিকদের সঙ্গে বৈঠকে বসে। সে সময় মিলগেট মূল্য কেজিতে ১ টাকা কমানো হয় এবং দুই সপ্তাহ দাম স্থিতিশীল রাখার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের চারদিনের মাথায় খাজানগরে মিনিকেট চালের দর মিলগেটে ৬৮ টাকা থেকে বেড়ে ৭০ ও পরে ৭২ টাকা হয় এবং কুষ্টিয়া পৌর বাজারে খুচরায় ৭৪ টাকায় উঠে যায়। দেশ এগ্রো লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল খালেক ও স্থানীয় মিল মালিকেরা জানান, ধান, শ্রমিকের মজুরি, বিদ্যুৎ, প্যাকেজিং ও জ্বালানিসহ সার্বিক খরচ বাড়ায় চালের দর সমন্বয় করতে বাধ্য হয়েছেন তারা। কারওয়ান বাজারের দোকান ব্যবস্থাপক শফিকুল ইসলাম ও অন্যান্য ব্যবসায়ীরা জানান, দিনাজপুর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে প্রতি ট্রাকে যথাক্রমে অতিরিক্ত ৩,০০০ টাকা ও ২,০০০ টাকা ভাড়া দিতে হওয়ায় পাইকারিতে কেজিতে ৫০ পয়সা থেকে ১ টাকা দর বাড়াতে হচ্ছে।

চালের বাজার নিয়ে ভোক্তারা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। মিরপুরের বাসিন্দা মারুফ জানান, প্রতি মাসেই কোনো না কোনো পণ্যের দাম বাড়ায় সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। নতুন বাজারের ক্রেতা নওশাদ আলী জানান, সেপ্টেম্বরের শুরুতে ৬০ টাকায় কেনা আটাশ চাল বর্তমানে ৬৪ টাকায় কিনতে হচ্ছে, যেখানে বিক্রেতারা অতিরিক্ত ট্রাকভাড়ার অজুহাত দিচ্ছেন।

চালের পাশাপাশি ঢাকার বাজারে সবজির দামও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। অধিকাংশ সবজি প্রতি কেজি ৭০ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। নতুন আসা শীতকালীন সবজি শিমের কেজি ১৫০ টাকা, ফুলকপি প্রতি পিস ৭০ টাকা এবং মূলা কেজিপ্রতি ৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে পেঁপে কিছুটা কম দামে কেজিপ্রতি ৩০ টাকায় মিলছে। বাজারে লম্বা বেগুন ১০০ টাকা, গোল বেগুন ১২০ টাকা, টমেটো ১২০-১৪০ টাকা, বরবটি, ঝিঙা ও করলা ৮০ টাকা, লাউ ৪০-৬০ টাকা এবং কচুরমুখি ৮০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। সাধারণ শসা ৫০-৬০ টাকা হলেও দেশি শসা ৮০-১ ১০০ টাকা। অবশ্য সরবরাহ বৃদ্ধি পাওয়ায় কিছুদিন আগের ২০০ টাকার কাঁচা মরিচ কমে ১২০-১৪০ টাকা কেজিতে নেমে এসেছে। নবোদয় বাজারের সবজি ক্রেতা আবু সাঈদ জানান, গুটি কতক সবজি কিনতেই বড় অংকের টাকা চলে যাচ্ছে, যা সংসারের বাজেট এলোমেলো করে দিচ্ছে।

আমিষের বাজারে ব্রয়লার ও সোনালি মুরগির দাম তুলনামূলক স্থিতিশীল রয়েছে। ব্রয়লার মুরগি প্রতি কেজি ১৮০ টাকা এবং সোনালি মুরগি ৩১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গরু মাংস বিক্রি হচ্ছে আগের মতোই প্রতি কেজি ৮০০ টাকায়। তবে ফার্মের মুরগির ডিমের বাজারে বাড়তি দর অব্যাহত রয়েছে; বাজারে প্রতি ডজন ডিম ১৫৫ থেকে ১৬০ টাকা এবং পাড়া-মহল্লার দোকানে চারটি ৫৫ টাকা হিসেবে ডজন ১৬৫ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে। ব্রয়লার বিক্রেতা তারেক হোসেন জানান, ব্রয়লারের দাম সপ্তাহের ব্যবধানে ১০ টাকা ওঠানামা করছে।

মাছের বাজারেও ক্রেতাদের চড়া দাম গুনতে হচ্ছে। বর্তমানে তেলাপিয়া ২৫০-২৬০ টাকা, পাঙাশ ২২০-২৩০ টাকা, রুই-কাতলা ৩৮০-৪২০ টাকা, পাবদা ৩৫০-৪০০ টাকা, বড় রুই ৪৫০- ৫০০ টাকা, চাষের কই ৩০০ টাকা, পোয়া ২৬০ টাকা এবং চাষের শিং ৩০০-৪৫০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। আকারভেদে চিংড়ির দাম ১,০০০ থেকে ১,৩০০ টাকা কেজি। মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের মাছ বিক্রেতা রমিজ উদ্দিন জানান, শুক্রবার চাহিদা বেশি থাকায় দাম কিছুটা বাড়ে এবং বর্তমানে ২০০ টাকার নিচে পাঙাশসহ খুব কম মাছই বাজারে পাওয়া যায়।

রাজধানীর কয়েকটি পাইকারি ও খুচরা বাজার ঘুরে দেখা গেছে, সরু চাল কেজিপ্রতি ৭৪-৭৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এক সপ্তাহ আগেও এর দাম ছিল ৭২ টাকা। মাঝারি মানের চালের দাম ৫৫-৬২ টাকা থেকে বেড়ে এখন ৫৮-৬৫ টাকা। তবে মোটা চালের দাম অপরিবর্তিত আছে, কেজি ৫০-৫৫ টাকা। বাজারের চিত্রের সঙ্গে মিল নেই সরকারি তথ্যের। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য বলছে, গত এক সপ্তাহে কোনো ধরনের চালেরই দাম বাড়েনি। উল্টো সরু চালের দাম কেজি প্রতি ১ দশমিক ২৭ শতাংশ কমেছে। অবশ্য গত এক মাসের ব্যবধানে মাঝারি মানের চালের দাম কেজি প্রতি ২ দশমিক ৫০ শতাংশ বেড়েছে বলে টিসিবির তথ্যে দেখা গেছে। গণমাধ্যমের প্রতিবেদন ও টিসিবির তথ্য অনুযায়ী, গত বছর এ সময় মোটা চাল কেজিপ্রতি ৫৫-৬৫ টাকায় বিক্রি হয়েছিল। মান অনুযায়ী সরু চালের দাম ছিল ৭৫-৮৫ টাকা।

মাছের বাজারেও স্বস্তি নেই মাছের বাজারেও ক্রেতাদের বেশি দাম গুনতে হচ্ছে। তেলাপিয়া কেজিপ্রতি ২৫০-২৬০ টাকা, পাঙাশ ২২০-২৩০ টাকা ও রুই-কাতলা ৩৮০ থেকে ৪২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। চিংড়ির দাম আকার ও মানভেদে কেজিতে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা। এ ছাড়া পাবদা ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা ও বড় রুই ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। চাষের কই পাওয়া যাচ্ছে ৩০০ টাকায়, পোয়া ২৬০ টাকা কেজি দরে। চাষের শিং মাছ আকারভেদে ৩০০ থেকে ৪৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মাঝারি আকারের রুই কেনা যাচ্ছে ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা কেজি দরে।