স্বাধীন সরকার,বিশেষ প্রতিবেদক: ফ্যামিলি কার্ড বানিয়ে দেওয়া, ই-রিকশার সরকারি লাইসেন্স পাইয়ে দেওয়া কিংবা সরকারি বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার আশ্বাস—সহজ-সরল ও অসহায় মানুষের বিশ্বাসকে পুঁজি করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বনানী থানাধীন ২০ নম্বর ওয়ার্ড ‘জ’ ইউনিট বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আনিস রহমানের বিরুদ্ধে। শুধু অর্থ আত্মসাৎই নয়, পাওনা টাকা ফেরত চাইলে ভুক্তভোগীদের হুমকি-ধামকি এবং মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর ভয় দেখানোর গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে এই নেতার বিরুদ্ধে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, একসময় যে আনিসের দিনে তিনবেলা খাবার জোগাড় করতে হিমশিম খেতে হতো, তিনি এখন রাতারাতি ‘আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ’। বৈধ কোনো চাকরি বা ব্যবসা না থাকা সত্ত্বেও তাঁর এই বেপরোয়া জীবনযাপন ও বিলাসী খরচের উৎস নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, মহাখালী ওয়্যারলেস গেট এলাকার ফুটপাত, কড়াইল বস্তির চাঁদাবাজি, মাদক কারবারিদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া এবং আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের পুনর্বাসন করাই এখন তাঁর আয়ের প্রধান উৎস।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আনিস রহমানের বাবা আজিজ রহমান ছিলেন বনানী থানা শ্রমিক লীগের সাবেক সভাপতি। টাকার অভাবে একসময় তিনি তাঁর স্ত্রীর বাবার বাড়ি থেকে পাওয়া পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করার উপক্রম করেছিলেন। সে সময় ধনাঢ্য আত্মীয়স্বজনদের সহায়তায় সেই সংকট কেটে যায়। কিন্তু বাবার সেই রাজনৈতিক ও পারিবারিক পথ ধরে আনিস এখন বনে গেছেন ধরাছোঁয়ার বাইরের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু। বর্তমানে তাঁর সঙ্গে সবসময় ঘুরে বেড়ায় চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী, কড়াইল বস্তির লাইনম্যান-চাঁদাবাজ ও পুলিশের বিতর্কিত সোর্সরা।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আনিস রহমানের একটি ছবিকে কেন্দ্র করে এলাকা জুড়ে বইছে সমালোচনার ঝড়। একটি অভিজাত ফাইভ স্টার রেস্টুরেন্টে তোলা সেই ছবিতে আনিসের সাথে দেখা গেছে বনানী থানা শ্রমিক লীগের সাবেক সহ-সভাপতি আনসার মজিবর ও বনানী থানা যুবলীগের সাবেক নেতা সবুজকে। অভিযোগ রয়েছে, ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর এই দু’জনই এখন বিএনপি নেতাদের ছায়াতলে থেকে কড়াইল বস্তির একাংশের চাঁদাবাজি ও ইয়াবা ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছেন। ছবিতে ২০ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির প্রচার সম্পাদক ফরিদ গাজীকেও দেখা গেছে, যার বিরুদ্ধে নিয়মিত ইয়াবা সেবনের অভিযোগ রয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবিটি ছড়িয়ে পড়ার পর সাধারণ মানুষ তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। ছবির কমেন্ট বক্সে এক নেটিজেন প্রশ্ন তুলেছেন, “ফাইভ স্টার রেস্টুরেন্টে খাওয়ার টাকা পেলেন কোথায়?” অন্য একজন লিখেছেন, “চাঁদাবাজির টাকায় আজ আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ!”
কড়াইল বস্তির এক নিঃস্ব ভুক্তভোগী নাম প্রকাশ না করার শর্তে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “ই-রিকশার লাইসেন্স দেওয়ার কথা বলে আনিস আমার কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা নেয়। দীর্ঘদিন ঘুরেও কাজ হয়নি। এখন টাকা ফেরত চাইলে আমাকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছে। আমরা কার কাছে বিচার চাইব?”
২০ নম্বর ওয়ার্ডের এক প্রবীণ বিএনপি নেতা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আনিসের মতো সুবিধাবাদী ও বিতর্কিত লোকজনের কারণে দলের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। যে লোক আগে দিন এনে দিন খেত, সে এখন প্রতিদিন নতুন নতুন দামি পোশাক পরে ঘোরে। এদের কোনো বৈধ আয় নেই, সব বস্তির চাঁদাবাজি ও আওয়ামী লীগ পুনর্বাসনের টাকা।”
অভিযোগের বিষয়ে জানতে আনিস রহমানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “আমার বিরুদ্ধে একটি চক্র অপপ্রচার চালাচ্ছে। আমি কোনো চাঁদাবাজি বা প্রতারণার সাথে যুক্ত নই। ফাইভ স্টার হোটেলের ছবিটি একটি ব্যক্তিগত আমন্ত্রণের ছিল, সেখানে রাজনৈতিক কোনো বিষয় ছিল না।”
এ বিষয়ে বনানী থানা বিএনপি’র এক শীর্ষ নেতা জানান, “দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে কেউ যদি অপকর্ম, চাঁদাবাজি বা সাধারণ মানুষকে হয়রানি করে, তবে তার দায় দল নেবে না। আনিস রহমানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো আমরা গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখছি। সত্যতা পাওয়া গেলে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”




