দি ক্রাইম ডেস্ক: মৃত্যুর পরও যেন শেষ আশ্রয়টুকু মিলছিল না ৬০ বছর বয়সী মেনোকার। জমি নিয়ে বিরোধের জেরে মৃত্যুর পর প্রায় এক দিন ধরে তার মরদেহ পড়ে ছিল বসতঘরের বারান্দায়। কবর খননের জায়গা না পেয়ে স্বজনদের কাটাতে হয়েছে নির্ঘুম রাত। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতা ও পুলিশ কয়েক দফা বৈঠক করেও তাৎক্ষণিক সমাধানে পৌঁছাতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত স্থানীয় এক বীর মুক্তিযোদ্ধা নিজের জমিতে মেনোকার দাফনের জন্য জায়গা দেওয়ায় সেই সংকটের অবসান হয়।
ঘটনাটি গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার মাওনা ইউনিয়নের আক্তাপাড়া গ্রামের।
নিহত মেনোকা ওই গ্রামের শ্রী গোপালের স্ত্রী। বার্ধক্যজনিত কারণে মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) দুপুরে তার মৃত্যু হয়। তিনি মান্দাই জনগোষ্ঠীর অনুসারী ছিলেন। গোপাল ও তার পরিবার দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে ওই এলাকায় বসবাস করছেন।
স্থানীয় ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, গোপাল স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে এক শতাংশ জমিতে একটি ছোট ঘর নির্মাণ করে বসবাস করছিলেন। প্রায় এক বছর আগে প্রতিবেশী ছফর উদ্দিনের কাছ থেকে আরও এক শতাংশ জমি দেড় লাখ টাকায় কেনার দাবি করেন তিনি। তবে মিউটেশন জটিলতার কারণে জমিটি রেজিস্ট্রি করা সম্ভব হয়নি। নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নিয়ে জমির মূল্য পরিশোধ করা হলেও বর্তমানে ছফর উদ্দিন জমি বিক্রির বিষয়টি অস্বীকার করছেন বলে পরিবারের অভিযোগ।
পরিবারের দাবি, ওই জমিতে মেনোকার কবর খনন করতে গেলে ছফর উদ্দিন ও তার পরিবারের সদস্যরা বাধা দেন। এ নিয়ে মঙ্গলবার দুপুরের পর থেকে স্থানীয় মাতব্বর, রাজনৈতিক নেতা-কর্মী ও জনপ্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে কয়েক দফা সালিস বৈঠক হয়। পরে পুলিশও ঘটনাস্থলে যায়। তবে কোনো সমাধান না হওয়ায় রাতভর মরদেহটি বাড়ির বারান্দায় রাখা হয়।
মঙ্গলবার রাত ১১টার দিকে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, বসতঘরের বারান্দায় মেনোকার মরদেহ রাখা হয়েছে। পাশে স্বজনরা অপেক্ষা করছেন। কবর খননের জায়গা না পাওয়ায় তারা রাত জেগে মরদেহ পাহারা দিচ্ছিলেন।
মেনোকার ভাই নিবারণ বলেন, ‘আমার ভগ্নিপতি আশা করে জমিটি কিনেছিলেন—ভবিষ্যতে প্রয়োজন হলে যেন ঘরের পাশে মাটি দিতে পারেন। কিন্তু এখন বিক্রেতা জমি বিক্রির বিষয়টিই অস্বীকার করছেন। কবর খনন করতে গেলে ছফর উদ্দিন ও তার পরিবারের লোকজন বাধা দেন। অনেক চেষ্টা করেও কোনো সমাধান হয়নি।’
মেনোকার ছেলে শ্রী সুনিল বলেন, ‘আমাদের পাশে দাঁড়ানোর মতো কাউকে পাইনি। মায়ের মরদেহ নিয়ে রাত জেগে বসে থাকতে হয়েছে। মেম্বার, চেয়ারম্যান, থানা পুলিশ—সবার কাছে গিয়েছি। কয়েক দফা সালিস বৈঠক হলেও কবর খননের অনুমতি পাইনি। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে ঘরের দরজার সামনে উঠানেই কবর খননের প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম।’
পরে স্থানীয় মাওনা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুল হক বিষয়টি জানতে পেরে নিজের ফসলি জমির এক পাশে মেনোকার দাফনের জন্য জায়গা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এতে দাফন নিয়ে তৈরি হওয়া সংকটের অবসান হয়।
ফজলুল হক বলেন, ‘ছফর উদ্দিনকে অনেক বুঝিয়েছি। কিন্তু তিনি কারও কথা মানতে রাজি হননি। কোনো সমাধান না হওয়ায় আমি নিজেই আমার জমিতে মেনোকার দাফনের ব্যবস্থা করে দিয়েছি।’
অভিযোগের বিষয়ে ছফর উদ্দিন বলেন, ‘আমি আমার জমিতে ওই নারীকে দাফন করতে দেব না। আমি তার কাছে কোনো জমি বিক্রি করিনি এবং কোনো টাকা-পয়সাও নিইনি।’
শ্রীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ শাহীনুর আলম বলেন, ‘খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছিল। পুলিশ সাধ্যমতো বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছে। ভুক্তভোগী পরিবারকে আদালতের আশ্রয় নিতে বলা হয়েছে।’
শ্রীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাহিদ ভূঁইয়া বলেন, ‘একজন আমাকে মেসেজের মাধ্যমে বিষয়টি জানিয়েছিলেন। পরে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানকে বিষয়টি দেখার দায়িত্ব দিয়েছিলাম। তিনি শেষ পর্যন্ত কী করেছেন, সে বিষয়ে আমাকে আপডেট জানাননি।’




