বিনোদন প্রতিবেদক: মহীতোষ তালুকদার তাপস গানের মানুষ। থাকেন রোড আইল্যান্ডে। নিউইয়র্ক, ওয়াশিংটন ডিসি, ম্যাসাচুসেটসের সকলেই তাকে এক নামে চেনেন। বিশেষ করে সংগীত জগতে যারা আছেন। কিন্তু এ বছর পহেলা বৈশাখ মহীতোষ তালুকদার তাপসকে নিউইয়র্কের বাঙালিরা নবরূপে আবিষ্কার করল। এ বছরই প্রথম নিউইয়র্কের সবচেয়ে বড় পর্যটক আকর্ষক এলাকা যাকে বলা হয় পৃথিবীর ক্রস রোডস সেই টাইমস স্কয়ারে বসেছিল প্রথমবারের মত বাংলা বর্ষবরণের আসর।
দিনটি ছিল শুক্রবার। কাজের দিন। সেইদিন সকালে মেয়েরা শাড়ি আর ছেলেরা পায়জামা-পাঞ্জাবি পরে সমবেত হয়েছিলেন টাইমস স্কয়ারে। সেখানে এসো হে বৈশাখ এসো এসো সহ বাংলাদেশের আবহমানকালের আলো-হাওয়া-মাটির গান গাওয়া হয় শতকণ্ঠে। আর এই শতকণ্ঠের গানের কন্ডাক্টর এই মহীতোষ তালুকদার তাপস।

এটা সোশাল মিডিয়ার যুগ। মহীতোষ প্রথম রিহার্সেলেই নিউইয়র্কসহ আশেপাশের শহরের শিল্পীদের হৃদয় জয় করেন। তার গানের নির্বাচন, শিল্পীদের গান তুলে দেয়ার প্রক্রিয়া, তাদের দিয়ে গাইয়ে নেয়া, শিল্পীদের কখনো ধমক দেয়া, কখনো আদর-স্নেহ-ভালোবাসায় মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়া, কখনো বুকে টেনে নেয়া সকলকে অভিভূত করেছে।
রিহার্সেলের ভিডিও ক্লিপ সোশাল মিডিয়ায় বারবার ভাইরাল হয়েছে। অনুষ্ঠানের আগেই শতকণ্ঠের অনুষ্ঠান নিয়ে আগ্রহ ছড়িয়ে পড়ে মুখে মুখে। সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু মহীতোষ তালুকদার তাপস। পহেলা বৈশাখের সেই বর্ষবরণ অনুষ্ঠান যে সফল হবে তা বলাই বাহুল্য। এই খবরটি আমেরিকা বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপি ছড়িয়ে পড়ল টেলিভিশনের মাধ্যমে বাংলা ভাষাভাষির কাছে। এরপরের দিনই ছিল বর্ষবরণের দিনভর অনুষ্ঠান জ্যাকসন হাইটসের ডাইভারসিটি প্লাজায়। সেখানেও হিট।
মহীতোষ তালুকদার তাপস প্রমাণ করলেন তার ক্ষমতার শক্তি। এর পরের সপ্তাহে তাজমহল পার্টি সেন্টারে নববর্ষ বরণ অনুষ্ঠানেও শতকণ্ঠে গান। তারপর রবীন্দ্র উৎসবে দুইদিন এবং বিপার ৩০ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানে। প্রত্যেকটি অনুষ্ঠানেই শতকণ্ঠে গান দর্শক শ্রোতারা প্রাণভরে উপভোগ করেন। বিশেষ করে মঞ্চে মহীতোষ তালুকদারের উপস্থিতি, গানের তাল ও কিউ ধরিয়ে দেয়া, সর্বোপরি শিল্পীদের প্রাণবন্ত করে রাখার জন্য তার এই কন্ডাক্টর সুলভ জেসচার খুবই কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। সেইসাথে ছিল তার হারমোনিয়াম বাজানোর অসাধারণ কুশলী হাত। নিউইয়র্কে এখন মহীতোষ তালুকদার একটি জনপ্রিয় এবং শ্রদ্ধার নাম। তিনি যেমন গানের ভেতরে ডুবে যেতে জানেন, তেমনই শিল্পীদের হৃদয়ও জয় করতে জানেন। গানের প্রতি ভালোবাসা না থাকলে এভাবে রোড আইল্যান্ড থেকে ঘন ঘন ছুটে আসতেন না। আর সর্বোপরি এত শিল্পীকে এক মঞ্চে আনার কৃতিত্বও তার।

না, মহীতোষ তালুকদার তাপস হঠাৎ তৈরি হননি। আমেরিকায় আসার আগে ঢাকার ছায়ানটে ওয়াহিদুল হক, নারায়ণচন্দ্র বসাক, রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা এবং তপন বৈদ্যর কাছে ফোর্থ ইয়ার পর্যন্ত গান শিখেছেন।
১৯৭৯ সালে ১১ বছর বয়সে তিনি খেলাঘরের ৫ জন শিল্পী দলের একজন হয়ে সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমে ইন্টারন্যাশনাল সামার ভিলেজে যোগ দেন। সুইডেন থেকে একটা গান শিখে এসে টিএসসিতে খেলাঘরের সম্মেলনে ওই কিশোর চেয়ারে দাঁড়িয়ে মিউজিক ডিরেকশন দিয়েছিলেন। আজ যা তিনি নিউইয়র্কে করলেন পরপর ৫টি অনুষ্ঠানে, তার শুরু ছিল সেটাই। আমেরিকায় ২০১৬, ২০১৭, ২০১৮ ও ২০১৯ সালে ওয়াশিংটন ডিসি, ভার্জিনিয়া, মেরিল্যান্ড ও বস্টনেও এইভাবে শতকণ্ঠে গান গাইয়েছেন শিল্পীদের দিয়ে।
মহীতোষ তালুকদার বাবাকে হারান তার ৬ বছর বয়সে। মা তাকে গানের হাতেখড়ি দিয়েছেন, বাজানো শিখিয়েছেন হারমোনিয়াম। এই হারমোনিয়াম ও একতারা নিয়ে স্টকহোমের সামার ভিলেজে যোগ দিলে সেখানকার সাংবাদিকরা আপ্লুত হয়ে সে সব ছবি ছাপে সংবাদপত্রে।
মহীতোষ জানান, ১৯৯১ সালে তিনি স্টুডেন্ট ভিসায় আমেরিকায় আসেন। ৯৫ সালে মাস্টার্স শেষ করে প্রভিডেন্সের মেয়রের অফিসে একাউন্ট ডিপার্টমেন্টে যোগ দেন। ২০০৩ সালে কবি শহীদ কাদরীর স্ক্রিপ্টে এমআইটিতে শতকণ্ঠে হাজার বছরের বাংলা গানের আয়োজন করেন।

মহীতোষ তালুকদার জানান, ঢাকায় প্রথম শিশুদের জন্য দর্শনীর বিনিময়ে আয়োজিত গুপী গাইন বাঘা বাইন নাটকে তিনি গুপীর চরিত্রে অভিনয় করেন। এই নাটকের নির্দেশনা দেন বাদল রহমান। কলেজে পড়ার সময় তিনি উদীচীতে যোগ দেন। তিনি তিন মহাজন কলিম শরাফী, সৈয়দ হাসান ইমাম ও পান্না কায়সারকে পান সভাপতি হিসাবে। আর এ সময় তিনি চার মহাজন শিল্পীর সামনে গান করার সুযোগ পান।
তারা হলেন- সলিল চৌধুরী, রুমা গুহঠাকুরতা, ভূপেন হাজারিকা ও হেমাঙ্গ বিশ্বাস। সলিল চৌধুরী তার মাথায় হাত রেখে বলেছিলেন মহীতোষ বাংলাদেশের সেরা ৫ হারমোনিয়াম বাদকের একজন।
মহীতোষ তালুকদার তাপস জানান, আমি জীবনে অনেক অনেক কিছু পেয়েছি। কিন্তু বড় আফসোস হয়, ১৯৭১এ কেন এত ছোট ছিলাম। আরেকটু বড় হলে তো মুক্তিযুদ্ধে যেতে পারতাম।
Post Views: 362



