আমেনা বেগম(এমএসএস): বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমানের হাতে প্রতিষ্ঠিত দলটি দীর্ঘ চার দশকের বেশি সময় ধরে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে ক্ষমতা, বিরোধী দল, আন্দোলন, নির্বাচন, রাজনৈতিক সংকট ও নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে দলটি আজ ৪৮ বছরে পা দিয়েছে। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বিএনপির পক্ষ থেকে দেশবাসী, দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মী, সমর্থক ও শুভানুধ্যায়ীদের শুভেচ্ছা জানানো হয়েছে। দিনটি উপলক্ষে কেন্দ্র থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন জেলা, মহানগর, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে দলীয় পতাকা উত্তোলন, প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন, আলোচনা সভা, সামাজিক ও পরিবেশবান্ধব কর্মসূচি এবং বিভিন্ন সাংগঠনিক আয়োজন।

যেভাবে বিএনপির যাত্রা শুরু
১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশে যে গভীর রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংকট তৈরি হয়েছিল, সেই সময়ের ধারাবাহিকতায় ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির প্রতিষ্ঠা হয়। দলের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। বিএনপির নিজস্ব ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, ঢাকার রমনা রেস্টুরেন্ট প্রাঙ্গণে এক সংবাদ সম্মেলনে জিয়াউর রহমান দলের প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। দলটি ১৯ দফা কর্মসূচিকে সামনে রেখে আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশ গড়ে তোলা, জাতীয় ঐক্য, গণতন্ত্র, সামাজিক ন্যায়বিচার ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের বিভিন্ন লক্ষ্য সামনে নিয়ে রাজনৈতিক যাত্রা শুরু করে। দলের প্রতিষ্ঠাকালীন দর্শনের অন্যতম ভিত্তি ছিল ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’। বিএনপির রাজনৈতিক বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, জাতীয় ঐক্য এবং জনগণের রাজনৈতিক অংশগ্রহণকে গুরুত্ব দিয়ে একটি বহুদলীয় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠাই ছিল দলটির অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক লক্ষ্য। প্রতিষ্ঠার পর অল্প সময়ের মধ্যেই বিএনপি দেশের অন্যতম বড় রাজনৈতিক সংগঠনে পরিণত হয়। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও মতের নেতাকর্মীদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা দলটি ধীরে ধীরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সাংগঠনিক ভিত্তি তৈরি করে।

জিয়াউর রহমানের নেতৃত্ব
বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দলটির রাজনৈতিক দর্শন ও সাংগঠনিক কাঠামো তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর নেতৃত্বে বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার পাশাপাশি দলীয় সংগঠন বিস্তারের দিকে মনোযোগ দেয়। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানের সময় জিয়াউর রহমান নিহত হন। তাঁর মৃত্যুর পর বিএনপির রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। পরবর্তী সময়ে দলের নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন তাঁর স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া।

খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে নতুন অধ্যায়
জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর বিএনপির নেতৃত্বে ধীরে ধীরে বেগম খালেদা জিয়ার উত্থান ঘটে। ১৯৮৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি দলের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন এবং পরবর্তী কয়েক দশক বিএনপির রাজনীতির কেন্দ্রীয় চরিত্রে পরিণত হন। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে বিএনপির নেতৃত্বে খালেদা জিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৯০ সালের গণআন্দোলনের মধ্য দিয়ে এরশাদ সরকারের পতনের পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৯১ সালে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও বিএনপি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ভূমিকা পালন করে। পরবর্তী সময়ে ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচনেও বিএনপি দেশের রাজনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবস্থান ধরে রাখে। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার গঠন করে এবং খালেদা জিয়া দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন।

আন্দোলন ও বিরোধী রাজনীতির দীর্ঘ সময়
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিএনপির পথ সবসময় মসৃণ ছিল না। ক্ষমতায় থাকার পাশাপাশি দলটিকে দীর্ঘ সময় বিরোধী দল হিসেবেও রাজনীতি করতে হয়েছে। নির্বাচন, সরকারবিরোধী আন্দোলন, রাজনৈতিক সংঘাত ও বিভিন্ন সাংগঠনিক সংকটের মধ্য দিয়ে বিএনপি তার রাজনৈতিক কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। বিশেষ করে ২০০৭ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দেশের রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। এরপর বিএনপি দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থেকে রাজনৈতিক আন্দোলন ও সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে যায়। বিএনপির রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০১৮ সালও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ওই সময় দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া কারাবন্দি হন। এর পর থেকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে তারেক রহমান দলীয় কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্ব দিয়ে আসেন।

তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন রাজনৈতিক পর্ব
বিএনপির বর্তমান চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে দলের নেতাকর্মী, শুভানুধ্যায়ী ও দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। এক বার্তায় তিনি বিএনপির প্রতিষ্ঠাকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেন এবং দলের ইতিহাসকে সাহস, সংগ্রাম, ত্যাগ ও সাফল্যের সঙ্গে যুক্ত করেন। তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দলীয় সংগঠন পুনর্গঠন, গণতান্ত্রিক অধিকার, নির্বাচন ও রাষ্ট্রীয় সংস্কারকে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে রাখার চেষ্টা করেছে। বর্তমানে দলটি সরকার পরিচালনার দায়িত্বেও রয়েছে বলে সাম্প্রতিক সংবাদ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে ব্যাপক কর্মসূচি
বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে কেন্দ্রীয়ভাবে কয়েক দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। আজ সকালে বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে দলের প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন বলে দলীয় কর্মসূচিতে জানানো হয়েছে। সেখানে ফাতেহা পাঠ ও পুষ্পস্তবক অর্পণের কর্মসূচিও রয়েছে। এ ছাড়া ৫ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের উদ্যোগে আলোচনা সভা, সমাবেশ ও অন্যান্য কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হচ্ছে। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচিতে সামাজিক ও পরিবেশবান্ধব কার্যক্রমকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে দেশব্যাপী বৃক্ষরোপণ ও মৎস্য অবমুক্তকরণের মতো কর্মসূচির পরিকল্পনা রয়েছে।

তৃণমূলেও প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আবহ
কেন্দ্রীয় কর্মসূচির পাশাপাশি বিএনপির জেলা, মহানগর, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যেও প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে ব্যাপক উৎসাহ দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন এলাকায় আলোচনা সভা, র‌্যালি, দোয়া মাহফিল ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের আয়োজন করা হয়েছে। চাঁদপুরসহ বিভিন্ন জেলায় দিনব্যাপী কর্মসূচি নেওয়ার খবর পাওয়া গেছে। আবার কোথাও কোথাও প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে কর্মসূচি আয়োজনকে কেন্দ্র করে স্থানীয় পর্যায়ে দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে মতপার্থক্য ও উত্তেজনার খবরও এসেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের বড় রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি দলের অতীত কর্মকাণ্ড মূল্যায়ন, বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরা এবং ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা জনগণের সামনে উপস্থাপনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।

১৯ দফা থেকে বর্তমান রাজনৈতিক দর্শন
বিএনপি প্রতিষ্ঠার সময় ১৯ দফা কর্মসূচিকে রাজনৈতিক ভিত্তি হিসেবে সামনে আনা হয়েছিল। দলের প্রতিষ্ঠাকালীন ঘোষণায় জাতীয় ঐক্য, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা, গণতন্ত্র, সামাজিক ন্যায়বিচার, জনগণের অংশগ্রহণ, প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ এবং দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার মতো বিষয় গুরুত্ব পায়। সময় পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বিএনপির রাজনৈতিক কর্মসূচি ও বক্তব্যেও পরিবর্তন এসেছে। বর্তমানে দলটি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা, জনগণের রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, রাষ্ট্রীয় সংস্কার এবং সুশাসনের ওপর জোর দিচ্ছে বলে দলীয় বক্তব্যে উঠে এসেছে।

দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসের মূল্যায়ন
প্রায় অর্ধশতাব্দীর রাজনৈতিক যাত্রায় বিএনপি বাংলাদেশের রাজনীতিতে একাধিকবার ক্ষমতায় এসেছে, আবার দীর্ঘ সময় বিরোধী দল হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছে। দলটির সমর্থকদের কাছে বিএনপি জাতীয়তাবাদ, বহুদলীয় গণতন্ত্র ও স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের রাজনীতির অন্যতম প্রধান প্রতিনিধিত্বকারী দল। অন্যদিকে বিএনপির রাজনৈতিক ইতিহাস নিয়ে বিরোধী রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন মহলের ভিন্ন মূল্যায়নও রয়েছে। দেশের রাজনীতিতে সংঘাত, নির্বাচন, আন্দোলন এবং ক্ষমতার পালাবদল নিয়ে বিএনপির ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা বিতর্ক রয়েছে। ফলে ৪৮ বছরের বিএনপির ইতিহাস একই সঙ্গে রাজনৈতিক সাফল্য, আন্দোলন, ক্ষমতা, বিরোধিতা, সংঘাত ও নানা বিতর্কের ইতিহাসও। তবে সব প্রতিকূলতা অতিক্রম করে দলটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি স্থায়ী সাংগঠনিক শক্তি হিসেবে নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে—এটি বিএনপির রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক।

সামনে কী চায় বিএনপি
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর বার্তায় বিএনপির নেতৃত্ব জনগণের রাজনৈতিক অধিকার, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব এবং জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। দলের বর্তমান নেতৃত্বের বক্তব্যে একটি গণতান্ত্রিক, সমৃদ্ধ ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ের কথা উঠে এসেছে। দলের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি দলীয় ঐক্য ও সাংগঠনিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা, জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করা এবং রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়ন করা। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আন্দোলনের পর রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পেলে একটি রাজনৈতিক দলের জন্য জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করা যেমন বড় সুযোগ, তেমনি বড় পরীক্ষাও।

৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর তাৎপর্য
১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর যে রাজনৈতিক সংগঠনের যাত্রা শুরু হয়েছিল, ২০২৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর সেই দল ৪৮ বছরে পদার্পণ করেছে। প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের নেতৃত্ব থেকে খালেদা জিয়ার দীর্ঘ রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং পরবর্তীতে তারেক রহমানের নেতৃত্ব—বিএনপির ইতিহাস বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। চার দশকের বেশি সময় ধরে নানা রাজনৈতিক উত্থান-পতন, সংকট ও পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে বিএনপি আজকের অবস্থানে এসেছে। তাই প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী দলটির নেতাকর্মীদের জন্য যেমন আনন্দ ও উৎসবের দিন, তেমনি অতীতের সাফল্য-ব্যর্থতা মূল্যায়ন এবং ভবিষ্যৎ পথচলার অঙ্গীকার নবায়নেরও দিন। ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে বিএনপির সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—আগামী দিনের বাংলাদেশকে তারা কীভাবে এগিয়ে নিতে চায় এবং জনগণের প্রত্যাশা কতটা পূরণ করতে পারে। প্রতিষ্ঠার ৪৮ বছর পর দলটির রাজনৈতিক শক্তি, সাংগঠনিক সক্ষমতা এবং রাষ্ট্র পরিচালনার কার্যকারিতাই ভবিষ্যতে বিএনপির রাজনৈতিক অবস্থান নির্ধারণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই দিনে বিএনপির নেতাকর্মীরা দলের প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন এবং দলের দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত নেতা-কর্মীদের অবদান স্মরণ করছেন। একই সঙ্গে নতুন প্রজন্মের জন্য একটি গণতান্ত্রিক, শান্তিপূর্ণ, সমৃদ্ধ ও জনকল্যাণমূলক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হচ্ছে।

আমেনা বেগম(এমএসএস): বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমানের হাতে প্রতিষ্ঠিত দলটি দীর্ঘ চার দশকের বেশি সময় ধরে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে ক্ষমতা, বিরোধী দল, আন্দোলন, নির্বাচন, রাজনৈতিক সংকট ও নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে দলটি আজ ৪৮ বছরে পা দিয়েছে। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বিএনপির পক্ষ থেকে দেশবাসী, দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মী, সমর্থক ও শুভানুধ্যায়ীদের শুভেচ্ছা জানানো হয়েছে। দিনটি উপলক্ষে কেন্দ্র থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন জেলা, মহানগর, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে দলীয় পতাকা উত্তোলন, প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন, আলোচনা সভা, সামাজিক ও পরিবেশবান্ধব কর্মসূচি এবং বিভিন্ন সাংগঠনিক আয়োজন।

যেভাবে বিএনপির যাত্রা শুরু
১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশে যে গভীর রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংকট তৈরি হয়েছিল, সেই সময়ের ধারাবাহিকতায় ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির প্রতিষ্ঠা হয়। দলের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। বিএনপির নিজস্ব ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, ঢাকার রমনা রেস্টুরেন্ট প্রাঙ্গণে এক সংবাদ সম্মেলনে জিয়াউর রহমান দলের প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। দলটি ১৯ দফা কর্মসূচিকে সামনে রেখে আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশ গড়ে তোলা, জাতীয় ঐক্য, গণতন্ত্র, সামাজিক ন্যায়বিচার ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের বিভিন্ন লক্ষ্য সামনে নিয়ে রাজনৈতিক যাত্রা শুরু করে। দলের প্রতিষ্ঠাকালীন দর্শনের অন্যতম ভিত্তি ছিল ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’। বিএনপির রাজনৈতিক বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, জাতীয় ঐক্য এবং জনগণের রাজনৈতিক অংশগ্রহণকে গুরুত্ব দিয়ে একটি বহুদলীয় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠাই ছিল দলটির অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক লক্ষ্য। প্রতিষ্ঠার পর অল্প সময়ের মধ্যেই বিএনপি দেশের অন্যতম বড় রাজনৈতিক সংগঠনে পরিণত হয়। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও মতের নেতাকর্মীদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা দলটি ধীরে ধীরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সাংগঠনিক ভিত্তি তৈরি করে।

জিয়াউর রহমানের নেতৃত্ব
বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দলটির রাজনৈতিক দর্শন ও সাংগঠনিক কাঠামো তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর নেতৃত্বে বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার পাশাপাশি দলীয় সংগঠন বিস্তারের দিকে মনোযোগ দেয়। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানের সময় জিয়াউর রহমান নিহত হন। তাঁর মৃত্যুর পর বিএনপির রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। পরবর্তী সময়ে দলের নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন তাঁর স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া।

খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে নতুন অধ্যায়
জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর বিএনপির নেতৃত্বে ধীরে ধীরে বেগম খালেদা জিয়ার উত্থান ঘটে। ১৯৮৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি দলের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন এবং পরবর্তী কয়েক দশক বিএনপির রাজনীতির কেন্দ্রীয় চরিত্রে পরিণত হন। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে বিএনপির নেতৃত্বে খালেদা জিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৯০ সালের গণআন্দোলনের মধ্য দিয়ে এরশাদ সরকারের পতনের পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৯১ সালে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও বিএনপি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ভূমিকা পালন করে। পরবর্তী সময়ে ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচনেও বিএনপি দেশের রাজনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবস্থান ধরে রাখে। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার গঠন করে এবং খালেদা জিয়া দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন।

আন্দোলন ও বিরোধী রাজনীতির দীর্ঘ সময়
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিএনপির পথ সবসময় মসৃণ ছিল না। ক্ষমতায় থাকার পাশাপাশি দলটিকে দীর্ঘ সময় বিরোধী দল হিসেবেও রাজনীতি করতে হয়েছে। নির্বাচন, সরকারবিরোধী আন্দোলন, রাজনৈতিক সংঘাত ও বিভিন্ন সাংগঠনিক সংকটের মধ্য দিয়ে বিএনপি তার রাজনৈতিক কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। বিশেষ করে ২০০৭ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দেশের রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। এরপর বিএনপি দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থেকে রাজনৈতিক আন্দোলন ও সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে যায়। বিএনপির রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০১৮ সালও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ওই সময় দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া কারাবন্দি হন। এর পর থেকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে তারেক রহমান দলীয় কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্ব দিয়ে আসেন।

তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন রাজনৈতিক পর্ব
বিএনপির বর্তমান চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে দলের নেতাকর্মী, শুভানুধ্যায়ী ও দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। এক বার্তায় তিনি বিএনপির প্রতিষ্ঠাকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেন এবং দলের ইতিহাসকে সাহস, সংগ্রাম, ত্যাগ ও সাফল্যের সঙ্গে যুক্ত করেন। তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দলীয় সংগঠন পুনর্গঠন, গণতান্ত্রিক অধিকার, নির্বাচন ও রাষ্ট্রীয় সংস্কারকে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে রাখার চেষ্টা করেছে। বর্তমানে দলটি সরকার পরিচালনার দায়িত্বেও রয়েছে বলে সাম্প্রতিক সংবাদ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে ব্যাপক কর্মসূচি
বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে কেন্দ্রীয়ভাবে কয়েক দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। আজ সকালে বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে দলের প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন বলে দলীয় কর্মসূচিতে জানানো হয়েছে। সেখানে ফাতেহা পাঠ ও পুষ্পস্তবক অর্পণের কর্মসূচিও রয়েছে। এ ছাড়া ৫ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের উদ্যোগে আলোচনা সভা, সমাবেশ ও অন্যান্য কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হচ্ছে। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচিতে সামাজিক ও পরিবেশবান্ধব কার্যক্রমকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে দেশব্যাপী বৃক্ষরোপণ ও মৎস্য অবমুক্তকরণের মতো কর্মসূচির পরিকল্পনা রয়েছে।

তৃণমূলেও প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আবহ
কেন্দ্রীয় কর্মসূচির পাশাপাশি বিএনপির জেলা, মহানগর, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যেও প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে ব্যাপক উৎসাহ দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন এলাকায় আলোচনা সভা, র‌্যালি, দোয়া মাহফিল ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের আয়োজন করা হয়েছে। চাঁদপুরসহ বিভিন্ন জেলায় দিনব্যাপী কর্মসূচি নেওয়ার খবর পাওয়া গেছে। আবার কোথাও কোথাও প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে কর্মসূচি আয়োজনকে কেন্দ্র করে স্থানীয় পর্যায়ে দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে মতপার্থক্য ও উত্তেজনার খবরও এসেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের বড় রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি দলের অতীত কর্মকাণ্ড মূল্যায়ন, বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরা এবং ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা জনগণের সামনে উপস্থাপনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।

১৯ দফা থেকে বর্তমান রাজনৈতিক দর্শন
বিএনপি প্রতিষ্ঠার সময় ১৯ দফা কর্মসূচিকে রাজনৈতিক ভিত্তি হিসেবে সামনে আনা হয়েছিল। দলের প্রতিষ্ঠাকালীন ঘোষণায় জাতীয় ঐক্য, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা, গণতন্ত্র, সামাজিক ন্যায়বিচার, জনগণের অংশগ্রহণ, প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ এবং দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার মতো বিষয় গুরুত্ব পায়। সময় পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বিএনপির রাজনৈতিক কর্মসূচি ও বক্তব্যেও পরিবর্তন এসেছে। বর্তমানে দলটি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা, জনগণের রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, রাষ্ট্রীয় সংস্কার এবং সুশাসনের ওপর জোর দিচ্ছে বলে দলীয় বক্তব্যে উঠে এসেছে।

দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসের মূল্যায়ন
প্রায় অর্ধশতাব্দীর রাজনৈতিক যাত্রায় বিএনপি বাংলাদেশের রাজনীতিতে একাধিকবার ক্ষমতায় এসেছে, আবার দীর্ঘ সময় বিরোধী দল হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছে। দলটির সমর্থকদের কাছে বিএনপি জাতীয়তাবাদ, বহুদলীয় গণতন্ত্র ও স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের রাজনীতির অন্যতম প্রধান প্রতিনিধিত্বকারী দল। অন্যদিকে বিএনপির রাজনৈতিক ইতিহাস নিয়ে বিরোধী রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন মহলের ভিন্ন মূল্যায়নও রয়েছে। দেশের রাজনীতিতে সংঘাত, নির্বাচন, আন্দোলন এবং ক্ষমতার পালাবদল নিয়ে বিএনপির ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা বিতর্ক রয়েছে। ফলে ৪৮ বছরের বিএনপির ইতিহাস একই সঙ্গে রাজনৈতিক সাফল্য, আন্দোলন, ক্ষমতা, বিরোধিতা, সংঘাত ও নানা বিতর্কের ইতিহাসও। তবে সব প্রতিকূলতা অতিক্রম করে দলটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি স্থায়ী সাংগঠনিক শক্তি হিসেবে নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে—এটি বিএনপির রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক।

সামনে কী চায় বিএনপি
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর বার্তায় বিএনপির নেতৃত্ব জনগণের রাজনৈতিক অধিকার, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব এবং জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। দলের বর্তমান নেতৃত্বের বক্তব্যে একটি গণতান্ত্রিক, সমৃদ্ধ ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ের কথা উঠে এসেছে। দলের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি দলীয় ঐক্য ও সাংগঠনিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা, জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করা এবং রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়ন করা। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আন্দোলনের পর রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পেলে একটি রাজনৈতিক দলের জন্য জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করা যেমন বড় সুযোগ, তেমনি বড় পরীক্ষাও।

৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর তাৎপর্য
১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর যে রাজনৈতিক সংগঠনের যাত্রা শুরু হয়েছিল, ২০২৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর সেই দল ৪৮ বছরে পদার্পণ করেছে। প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের নেতৃত্ব থেকে খালেদা জিয়ার দীর্ঘ রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং পরবর্তীতে তারেক রহমানের নেতৃত্ব—বিএনপির ইতিহাস বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। চার দশকের বেশি সময় ধরে নানা রাজনৈতিক উত্থান-পতন, সংকট ও পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে বিএনপি আজকের অবস্থানে এসেছে। তাই প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী দলটির নেতাকর্মীদের জন্য যেমন আনন্দ ও উৎসবের দিন, তেমনি অতীতের সাফল্য-ব্যর্থতা মূল্যায়ন এবং ভবিষ্যৎ পথচলার অঙ্গীকার নবায়নেরও দিন। ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে বিএনপির সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—আগামী দিনের বাংলাদেশকে তারা কীভাবে এগিয়ে নিতে চায় এবং জনগণের প্রত্যাশা কতটা পূরণ করতে পারে। প্রতিষ্ঠার ৪৮ বছর পর দলটির রাজনৈতিক শক্তি, সাংগঠনিক সক্ষমতা এবং রাষ্ট্র পরিচালনার কার্যকারিতাই ভবিষ্যতে বিএনপির রাজনৈতিক অবস্থান নির্ধারণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই দিনে বিএনপির নেতাকর্মীরা দলের প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন এবং দলের দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত নেতা-কর্মীদের অবদান স্মরণ করছেন। একই সঙ্গে নতুন প্রজন্মের জন্য একটি গণতান্ত্রিক, শান্তিপূর্ণ, সমৃদ্ধ ও জনকল্যাণমূলক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হচ্ছে।